অনলাইন বাংলা সংবাদ পত্র

ইনসাইড অফ আরব বসন্ত (পর্ব –১) -তৌহিদুল ইসলাম

বিষয় – ইয়েমেন
ইয়েমেন মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে অন্যতম একটি উল্লেখযোগ্য দেশ । এটি আরব উপদ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে মরুভূমি ও পর্বত বেষ্টিত একটি ভূখণ্ড। ইয়েমেনের জনসংখ্যা তেমন বেশী নয়। দেশের অর্ধেকের বেশি অংশ বসবাসের অযোগ্য। এখানকার আরবেরা বেশির ভাগই গ্রামীণ। প্রাচীনকালে এখানে অনেকগুলি সমৃদ্ধ সভ্যতার অবস্থান ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে এলাকাটির গুরুত্ব হ্রাস পায় এবং এক হাজার বছরেরও বেশি সময় এটি একটি দরিদ্র ও অবহেলিত দেশ হিসেবে বিরাজ করছিল। বিংশ শতাব্দীর শেষে এসে এখানে খনিজ তেল আবিষ্কার হলে ইয়েমেনের অর্থনৈতিক উন্নতি ও জনগণের জীবনের মান উন্নয়নের সম্ভাবনা দেখা দেয়।

১৯৯০ সালে ইয়েমেন আরব প্রজাতন্ত্র (উত্তর ইয়েমেন) এবং গণপ্রজাতন্ত্রী ইয়েমেন (দক্ষিণ ইয়েমেন) দেশ দুইটিকে একত্রিত করে ইয়েমেন প্রজাতন্ত্র গঠন করা হয়। সানা’আ ইয়েমেন প্রজাতন্ত্রের রাজধানী ও বৃহত্তম শহর। ইয়েমেনের পশ্চিমে লোহিত সাগর এবং দক্ষিণে এডেন উপসাগর। এটি আফ্রিকা মহাদেশ থেকে বাব এল মান্দেব প্রণালীর মাধ্যমে বিচ্ছিন্ন। দেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বে সৌদি আরব এবং পূর্বে ওমান অবস্থিত। সৌদি আরব ও ওমানই ইয়েমেনের প্রতিবেশী রাষ্ট্র। ইয়েমেনের আয়তন ৫,২৭,৯৭০ বর্গকিমি ।

প্রাচীন ইতিহাস

খ্রিস্টপূর্ব ২,০০০ অব্দের দিকে উত্তর ইয়েমেনে প্রথম জনবসতি গড়ে ওঠে। খ্রিস্টপূর্ব ১৪০০ অব্দের দিকে এ অঞ্চল ব্যবসায়ীদের জন্য অতি উত্তম রুট হিসেবে বিবেচিত হতে থাকে। খ্রিস্টের সময়ে এ অঞ্চলের স্বাভাবিক গতি মন্থর হয়ে পড়ে। এ সময়ে আবিসিনিয়া (ইথিওপিয়া) এ অঞ্চল দখল করে। পরবর্তী প্রায় ১৩০০ বছর এ অঞ্চলের বিভিন্ন উপজাতি ও ধর্মীয় গোত্র মিশরীয় ও টার্কসদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত ছিল। ৮৯৭ সালের গোড়ার দিকে একজন ইমামের নেতৃত্বে এদেশ শাসিত হতে থাকে।

আধুনিক ইতিহাস

১৫১৭ থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত উত্তর ইয়েমেন অটোম্যান সাম্রাজ্যের অধিনস্থ ছিল। ১৯২৪ সালে এদেশ লাওসান চুক্তির মাধ্যমে অটোম্যান টার্ক সাম্রাজ্য থেকে মুক্ত হয়। প্রাচীনকাল থেকেই লোহিত সাগর ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ার মধ্যে সমুদ্রপথের একমাত্র এবং গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ফলে আরব সাগর তীরবর্তী দণি ইয়েমেন বাণিজ্যিক দিক দিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকায় এ অঞ্চলের জীবনযাত্রার মান উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকে। আরবে মুসলিম জাগরণের পরপরই এ অঞ্চলে ইসলাম ধর্ম প্রসার লাভ করে। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মুসলমান উপজাতীয় প্রধানরা এ অঞ্চল শাসন করে আসছিল। এরই মধ্যে সমুদ্রপথে একটি বৃটিশ জাহাজের ধ্বংসাবশেষ চুর হয়ে যাওয়ার অজুহাতে ১৮৩৯ সালে বৃটেন এডেন দখল করে। ১৯৩৭ সালে এ অঞ্চল বৃটিশ রাজশাসনের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত এডেন বৃটিশ ভারতের অংশ হিসেবে শাসিত হয়ে আসছিল। ১৯৬৭ সালের ৩০ নভেম্বর দক্ষিণ ইয়েমেন স্বাধীনতা লাভ করে। ১৯৯০ সালের মে মাসের পূর্ব পর্যন্ত এদেশ দুটি আলাদা রাষ্ট্র উত্তর ইয়েমেন এবং দক্ষিণ ইয়েমেন নামে বিভক্ত ছিল। উভয় দেশ একত্রিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত উত্তর ইয়েমেন গণপ্রজাতন্ত্রী এবং দক্ষিণ ইয়েমেন কমিউনিস্ট শাসনাধীনে ছিল।

ভূগোলিক পরিবেষ

ইয়েমেন দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়াতে আরব উপদ্বীপের দক্ষিণ প্রান্তে ওমান ও সৌদি আরবের মধ্যখানে অবস্থিত। দেশটি লোহিত সাগর ও ভারত মহাসাগরকে সংযোগকারী বাব-এল-মান্দের প্রণালীর মুখে অবস্থিত। লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত পেরিম দ্বীপ এবং এডেন উপসাগরে অবস্থিত সোকোত্রা দ্বীপকে গণনায় ধরে ইয়েমেনের মোট আয়তন ৫,২৭,৯৭০ বর্গকিলোমিটার। ইয়েমেনের স্থলসীমান্তের মোট দৈর্ঘ্য ১,৭৪৬ কিলোমিটার। ইয়েমেন আরব মালভূমির দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত। দেশটির পর্বতময় অভ্যন্তরভাগ পশ্চিম, দক্ষিণ ও পূর্বে সরু উপকূলীয় সমভূমি এবং উত্তরে সৌদি আরবের সাথে সীমান্তে মরুভূমি দ্বারা বেষ্টিত। লোহিত সাগরের উপকূল ঘেঁষে প্রলম্বিত প্রায় ৪১৯ কিলোমিটার দীর্ঘ অর্ধ-ঊষর উপকূলীয় সমভূমিটি তিহামাহ নামে পরিচিত। অভ্যন্তরভাগের পর্বতগুলি বিভিন্ন উচ্চতার হয়। সর্বোচ্চ পর্বত জাবাল আন নাবি শুয়াইবসমুদ্রতল থেকে ৩,৭৬০ উঁচুতে অবস্থিত। উচ্চভূমিগুলির ভেতর দিয়ে বেশ কিছু ওয়াদি বা নদী উপত্যকা চলে গেছে; এগুলি গ্রীষ্মকালে শুষ্ক থাকে। ইয়েমেনের কোন স্থায়ী নদী নেই। ওয়াদিগুলির মধ্যে হাজরামুত ওয়াদিটির উপরের অংশে পলিভূমি ও পানির দেখা মেলে। উত্তর ও পূর্বের মালভূমি ও মরুভূমি উত্তপ্ত ও শুষ্ক এবং এখানে গাছপালা তেমন হয় না ।

রাজনৈতিক ব্যবস্থা

ইয়েমেনের রাজনীতি একটি রাষ্ট্রপতিশাসিত প্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কাঠামোয় সংঘটিত হয়। রাষ্ট্রপতি হলেন রাষ্ট্রের প্রধান। সরকারপ্রধান হলেন রাষ্ট্রপতি কর্তৃক মনোনীত প্রধানমন্ত্রী। রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতা সরকারের উপর ন্যস্ত। আইন প্রণয়নের ক্ষমতা সরকার এবং আইনসভা উভয়ের উপর ন্যস্ত। বিচার বিভাগ তাত্ত্বিকভাবে নির্বাহী বিভাগ ও আইনসভা হতে স্বাধীন।

অর্থনীতি

ইয়েমেনে পর্যটকদের জন্য অনেক আকর্ষণীয় স্থান আছে। এদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল এর রাজধানী সানা। সানা শহরটি সম্ভবত মনুষ্যনির্মিত প্রথম শহরগুলির একটি। ইউনেস্কো এটিকে World Heritage of Mankind বলে ঘোষণা করেছে। রাব আল খালি মরুভূমির প্রান্তে অবস্থিত মারিব শহর ছিল শেবার রাণীর সাম্রাজ্যের রাজধানী। এখানে ৩০০০ বছর আগে নির্মিত বাঁধ এখনও দেখতে পাওয়া যায়। ইয়েমেন পূর্বে বিভিন্ন সাম্রাজ্যের অংশ ছিল এবং এদের রাজধানীগুলি দেশের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে আছে। প্রতিটিতেই সেই আমলের বিশেষ নিদর্শন দেখতে পাওয়া যায়। ইসলামের একেবারে প্রথম দিককার হযরত মুহাম্মদের জীবদ্দশাকালীন মসজিদ থেকে শুরু করে ইসলামী যুগের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় ও আরও অনেক প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী স্থানে ইয়েমেন পরিপূর্ণ।

জনসংখ্যা

ইয়েমেনের জনসংখ্যা প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ এর মত । জনসংখ্যার বেশির ভাগই ইয়েমেনী আরবি ভাষায় কথা বলেন। দেশের দক্ষিণ-পূর্বে ওমান ও সৌদি আরবের সাথে সীমান্তবর্তী এলাকায় মেহরি নামের দক্ষিণী আরবি ভাষার প্রচলন আছে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে সোমালিয়া থেকে আগত লোহিত সাগরের উপকূলীয় অঞ্চলগুলিতে অভিবাসী সোমালি সম্প্রদায়ে সোমালি ভাষার প্রচলন আছে। ইয়েমেন পাহাড়ি ও রুক্ষ অঞ্চল বলে এখানকার প্রায়-বিচ্ছিন্ন লোকালয় ও সম্প্রদায়গুলিতে প্রচলিত আরবি ভাষার মধ্যে বিচিত্রতার পরিমাণ বেশি এবং এগুলিতে প্রাচীন আরবির বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য এখনও সংরক্ষিত ।

ইয়েমেনের রাজনৈতিক ইতিহাস

ইয়েমেন মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রাচীন বাণিজ্যকেন্দ্র এবং এই বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল এক সমৃদ্ধশালী দেশ। বাণিজ্য এবং কৌশলগত ভৌগলিক কারণে এই অঞ্চলের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল পার্সিয়ান, অটোমান, ব্রিটিশ। বর্তমানের ইয়েমেন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ইতিহাস দেখতে হলে ফিরে যেতে হবে ৭০০ শতকের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে। তখন ইসলামের প্রসার চলছে দিকে দিকে। খলিফা ইসলাম প্রচারের জন্য একের পর এক রাজ্য জয় করে চলেছেন। রাজ্য জয় হলে ধর্মের সাথে পাওয়া যায় প্রভাব, প্রতিপত্তি, রাজনীতি ও অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ। ক্ষমতা দখল করে ইমামের উত্তরসূরি শিয়া মুসলিমরা ইয়েমেন শাসন করে আসছিল তখন। এরপরে ১১ শতকে ইয়েমেন সরাসরি খলিফার শাসনে চলে আসে। খলিফার শাসন আমলেই ইয়েমেন অটোমান সাম্রাজ্যের আক্রমণের শিকার হয়, দখল করে নেয় দেশটির দক্ষিণাঞ্চল। রুটির মত ভাগ হয়ে যাওয়া দেশটির উত্তরাঞ্চলের দখল নেয় ব্রিটিশ সাম্রাজ্য। ১৯১৮ সালে অটোমান শাসকদের কবল থেকে মুক্ত হলেও ইয়েমেন ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত ব্রিটেনের কলোনি হিসেবে পরাধীনতার ঘানি ও গ্লানি বহন করেছে। তখনও ইয়েমেন দেশটি উত্তর ইয়েমেন ও দক্ষিণ ইয়েমেন দুইভাগে বিভক্ত ছিল। উত্তর ইয়েমেন শিয়া আর দক্ষিণ ইয়েমেনে কমিউনিজমের চর্চা চলছিল। ১৯৯০ সালের ২২ মে ইয়েমেনের একটা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দিন। এইদিন দুই ইয়েমেন মনে করে এখনই সময় সব ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে একত্রিতভাবে একটি অভিন্ন রাষ্ট্র গঠন করা এবং পুনর্জন্ম নেয়া এই দেশের প্রাতিষ্ঠানিক নাম দেয়া হয় রিপাবলিক অফ ইয়েমেন ।

এতো হচ্ছে ইয়েমেন সম্পর্কে কিছু পরিচিতি। এখন আশাজাক মূল বিষয়ে। ইয়েমেনের সাথে শিমান্ত রয়েছে মূলত সৌদিআরব ও ওমানের সাথে। অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ আর সৌদি জোটের আগ্রাসনে এখানে বর্তমানে মানবিক বিপর্যয় বিরাজমান। এই যুদ্ধের পিছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে, তা হচ্ছে – প্রক্সি যুদ্ধ, ধর্মীয়ও মতবিরোধ, রাজনৈতিক ব্যক্তি ও দলগুলির মাঝে ক্ষমতার দ্বন্ধ। এই যুদ্ধ সংঘাত হঠাত করে সৃষ্টি হয় না। দীর্ঘ দিনের পরিকল্পনা, প্রতিশোধমূলক মনোভাব আর সাথে পশ্চিমাদের রাজনৈতিক কূটনৈতিক কৌশল যুক্ত। এই কারণগুলির কিছু ব্যাখ্যা রয়েছে। তা হচ্ছে , প্রক্সি যুদ্ধ – সৌদি আরব এবং ইরান তাদের ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য ইয়েমেনকে যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করছে । এই অঞ্চলের দুটি পরাশক্তি নিজেদের আধিপত্যের লড়াই করছে । ১৯৭৯ সালের ইরানের ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে এবং ইয়েমেনের বিভিন্ন অংশকে সমর্থন করছে । আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের সমর্থনে গঠিত জোটের নেতৃতে আছে সৌদি আরব । সৌদির ধারণা হুথি বিদ্রোহীদের অস্ত্রের যোগান দিচ্ছে ইরান । কিন্তু তাদের প্রতি করা অভিযোগ অস্বীকার করে ইরান বলছে তারা হুথিদের শুধু নৈতিক সমর্থন দিচ্ছে । ধর্মীয়ও দিক থেকে – ইয়েমেনের মোট জনসংখ্যার ৯৯.৫% মুসলমান । যার মধ্যে ৫৪% সুন্নী আর ৪৬% হচ্ছে শিয়া । শিয়ারাই মূলত হচ্ছে হুথি । এখানে সুন্নী মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকারকেই সৌদি জোট সমর্থন দিচ্ছে । ইসলামের এই দুই শাখার যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে ইয়েমেন । এর পাশাপাশি সুন্নীদের সাথে আইএস এবং আলকায়দার আঁতাত আছে বলে মনে করা হচ্ছে । দ্বন্ধ – আলী আবদুল্লাহ সালেহ এবং আবদ্রাবুহ মানসুর হাদি একসাথে কাজ করতেন । আলী আবদুল্লাহ সালেহ তিন দশকের জন্য এবং তার সহকারি আবদ্রাবুহ মানসুর হাদি আরো ২০ বছর দেশ পরিচালনা করেছিলেন । কিন্তু সালের আরব বসন্তের সময় তারা একে অন্যের শত্রু হয়ে যান । তখন আলী আবদুল্লাহ সালেহ আবদ্রাবুহ মানসুর হাদির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে বাধ্য হয়েছিলেন । সেই সময় আবদ্রাবুহ মানসুর হাদিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সমর্থন দিয়েছিল । তাতেআলী আবদুল্লাহ সালেহ নতুন জোট গড়ার সিদ্ধান্ত নিলেন । তখন আবদ্রাবুহ মানসুর হাদিকে উৎখাত করতে তার সঙ্গি হলো পূর্বের শত্রু হুথিরা । যুদ্ধ শুরু হোলে আবদ্রাবুহ মানসুর হাদি জীবন রক্ষার জন্য সৌদি আরব পালিয়ে যান । ২০১৫ সালের মার্চে সৌদি জোট হুথিদের উপর বিমান হামলা শুরু করে । কিন্তু ইয়েমেনের রাজধানী সানা থেকে তারা হুথি বা আলী আবদুল্লাহ সালেহ সমর্থকদের তাড়াতে ব্যর্থ হয় । পরে অবস্থার পরিবর্তন করে আলী আবদুল্লাহ সালেহ বলেন, তিনি সরকার ও সৌদির সাথে নতুন সম্পর্ক শুরু করবেন । সে সময় সানা থেকে পালানোর চেষ্টা করলে হুথিরা তাকে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগে হত্যা করে । মি.সালেহ চুক্তি সম্পাদনে বিখ্যাত ছিলেন । যিনি অচল অবস্থা নিরসনে মধ্যস্ততা করতে পারতেন । আর তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সব আশা শেষ হয়ে গেল । যাত্রা শুরু হোল এই যুদ্ধের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ।

ইয়েমেনে কিভাবে বেজে উঠল যুদ্ধের দামামা: ২০১১ সালে আরব বসন্তে জেগে উঠল যত জীর্ণ প্রাণ। ইয়েমেনের রাজধানী সা’নায় দুর্নীতি বিরোধী শ্লোগান দিতে দিতে জড়ো হতে লাগল হাজার হাজার গণমানুষের জোয়ার। সেই জোয়ারের ঢেউতে দুর্নীতি ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে ভেসে যান ইয়েমেনের তখনকার প্রেসিডেন্ট আলী আব্দুল্লাহ সালেহ। সালেহ’র সহকারী আবেদ রাবো হাদি এগিয়ে আসেন শূন্য স্থান পূরণের আশায়। গণজোয়ার কিছুদিনের মধ্যে গণরোষে পরিণত হয়। দেশজুড়ে দেখা দেয় অসন্তোষ। অপরিকল্পিত ও অনিয়ন্ত্রিত আন্দোলনের ফলে দেখা দেয় জাতীয় রাজনৈতিক অস্থিরতা। এই এই রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং গনরোষের সুযোগ কাজে লাগিয়ে আরব উপদ্বীপের রাজনৈতিক রঙ্গমঞ্চে ঢুকে পড়ে আল কায়েদার মত ভয়ানক ইসলামী সন্ত্রাসী সংগঠন। ২০১১ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতাকে কাজে লাগিয়ে উগ্র মৌলবাদী সংগঠনটি ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চল দখল করে কায়েম করেছে সন্ত্রাসের রাজত্ব। এই রাজনৈতিক অস্থিরতায় জন্ম নেয় আরো একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠী। যার নাম হুতি আন্দোলন। হুতি বিদ্রোহীরা নিজেদেরকে আনসার আল্লাহ (আল্লাহর সমর্থনকারী) বলে ঘোষণা দেয়। ইয়েমেনের সরকারের বিপক্ষে দশকব্যাপী চলমান আন্দোলন করে হুতি বিদ্রোহীরা ইয়েমেনের শিয়া অধ্যুষিত উত্তরাঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের দখলে নিয়ে নেয়। এদিকে হাদির সরকারের জনপ্রিয়তা দিনকে দিন তলায় এসে ঠেকেছে। আর বিদ্রোহীরা ইয়েমেনে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের চেষ্টা করছে । ২০১৪ সালে যখন হুতি বিদ্রোহীরা ইয়েমেনের রাজধানী সা’নায় প্রবেশ করে তখন প্রাণের ভয়ে প্রেসিডেন্ট আবেদ রাবো হাদি দক্ষিণাঞ্চলের শহর এডেনে পালিয়ে যান। প্রেসিডেন্ট আবেদ রাবো গণমাধ্যমে অভিযোগ করেন হুতি বিদ্রোহীরা অবৈধভাবে বন্দুকের মুখে ক্ষমতা দখল করেছে। অন্যদিকে হুতি বিদ্রোহীরা প্রচার করতে লাগল সীমাহীন দুর্নীতিগ্রস্ত হাদির বিরুদ্ধে এটা সর্বাত্মক প্রতিরোধ এবং গণজাগরণ ।
সৌদি আরব এবং ইরান কিভাবে যুদ্ধে যুক্ত হলো: ইয়েমেনের সাথে সৌদি আরবের ১১০০ মাইলের সীমান্ত আছে। সুতরাং ইয়েমেনে অব্যাহতভাবে শিয়া হুতি বিদ্রোহীদের উত্থান সৌদি আরবের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াল। সুন্নি প্রধান সৌদি আরব ইয়েমেনে শিয়া সম্প্রদায়ের উত্থানকে শিয়া অধ্যুষিত চির প্রতিদ্বন্দ্বী আঞ্চলিক শত্রু ইরানের ইন্ধন থাকতে পারে বলে ধারণা করে। ইরানকে উচিৎ শিক্ষা দিতে সৌদি আরব কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, মিশর, মরক্কো, জর্ডান, সুদান, সেনেগালকে সাথে কৌশলগত মৈত্রী গড়ে তোলে। মৈত্রীর সমর্থনে থাকল আমেরিকা, ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড। ২০১৫ সালের মার্চ থেকে সৌদি আরবের নেতৃত্বে মিত্রবাহিনী ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী অবস্থানে ক্রমাগত বিমান হামলা চালানো শুরু করে। এখন সৌদি আরব ইয়েমেনে যে বোমা ফেলছে তার গায়ে লেখা মেইড ইন আমেরিকা, আরবের সামরিক বাহিনী যে বিমানে বোমা বহন করে হুতিদের মাথায় আর বাসস্থানে ফেলে দিয়েছে সে বিমানগুলো কেনা হয়েছে ইংল্যান্ড থেকে, যে পাইলটরা হুতিদের মৃত্যু উপহার দিয়ে আসে তারা আমেরিকা থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে আসে। বিতর্কের শুরু থেকেই ইরান হুতি বিদ্রোহীদের সাথে তাদের কোন সম্পর্ক বা যোগাযোগ অস্বীকার করে আসছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকর্তাগণ দাবী করেছে ইরান, ইয়েমেনের প্রতিবেশী ওমানের মাধ্যমের অস্ত্র চোরাচালানি করেছে এবং তাদের কাছে প্রমাণ আছে। ইয়েমেনের হুতি শিয়া এবং ইরানের শিয়া একই মতাদর্শের হলেও তাদের মাঝে ধর্মীয় আচরণগত পার্থক্য আছে। ইরানের শিয়া মতাবলম্বীরা বারোজন ইমামের পরম্পরা মেনে চলেন। পক্ষান্তরে ইয়েমেনের শিয়ারা ইমাম হুসাইনের পৌত্র জায়েদ ইবনে আলীর প্রচারিত অপেক্ষাকৃত উদার নীতি আদর্শের ধর্ম চর্চা। জায়েদের অনুসারী শিয়ারা ধর্মের বিষয়ে পরিবর্তনে বিশ্বাসী এবং তারা মানুষের অতিমানবিকতায় বিশ্বাস করে না। জায়েদ পন্থী শিয়াদের বিস্তার ঘটেছে পাহাড়ি আদিবাসী গোত্র মাঝে। জায়েদ পন্থী শিয়া ইয়েমেনে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্র পরিচালনা করেছিল। কৌশলগত সীমাবদ্ধতার কারণে ইরান বাস্তবে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের অল্প বিস্তর রাজনৈতিকভাবে সমর্থন যুগিয়ে যাচ্ছে হয়ত সামরিক দিক দিয়েও তাদের সাহায্য করে থাকে। কিন্তু বিগত ৩৫ বছরে বদলে গেছে অনেক কিছু। ইরানে ইসলামিক বিপ্লবের মাধ্যমে সুন্নিদের হটিয়ে ক্ষমতায় এসেছে শিয়া। তারা বিভিন্ন কারণে সৌদি আরবের সাথে তিক্ত বিরক্ত। এমনকি গতবছর ইরান সরকার সেদেশের নাগরিকদের হজ্বের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। তদুপরি সৌদি মনে করে ইরান ইয়েমেনের শিয়া হুতি বিদ্রোহীদের অস্ত্র, অর্থ, জ্বালানী দিয়ে সাহায্য করে। সব কিছু-মিলে সৌদি আরব ক্ষমতা হারানোর অজানা আশংকায় ভুগছে এবং ইরানকে মনে করে সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী। দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন আঞ্চলিক ইস্যুতে সৌদি আরব এবং ইরানের মাঝে অচলাবস্থা বিরাজ করছে। যেমন তেহরান সরাসরি রাজনৈতিক এবং সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাসার আল আসাদকে সুরক্ষা দিয়ে যাচ্ছে। লেবানন-ভিত্তিক শক্তিশালী ধর্মীয় সংগঠন হিজবুল্লাহকে নৈতিকভাবে সমর্থন যুগিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে রিয়াদ সিরিয়ার বিদ্রোহী পক্ষকে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ মনে করেন, মধ্য প্রাচ্যে সৌদি আরব আর ইরানের মাঝে ঠাণ্ডা লড়াইয়ের “ড্রেস রিহারসেল” চলছে ইয়েমেনে। তাই ইয়েমেনে আক্রমণ করে সম্ভাব্য শত্রু ইরানকে সতর্কবার্তা পৌঁছে দিচ্ছে । ঝিকে মেরে বউকে শিক্ষা দেয়া যাকে বলে আরকি ।

আরব বসন্ত – আরব বসন্ত হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের এক মরিচিকাময় গণবিপ্লব । কিন্তু সত্যিকার গণবিপ্লব বলতে যা বুঝায় এটি ঠিক তেমনটি নয় । একে অবিহিত করা হচ্ছে গণজাগরণ ও গণবিদ্রোহ হিসেবে । আরব বসন্তের যাত্রা শুরু হয়েছে ২০১০ সাল থেকে । গণবিক্ষোভের শুরু মিশরে; এরপর তা লিবিয়া, সিরিয়া, ইয়েমেন সহ বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে যায়। প্রথমে মিশরে প্রেসিডেন্ট হোসনি মুবারকের পতন হয়। পরে লিবিয়ায় মুয়াম্মর আল-গাদ্দাফি জামানার অবসান হয়। আরব বিশ্বের এই গনঅভ্যূত্থানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং এর ইউরোপীয় ন্যাটোভুক্ত সহচর রাষ্ট্রগুলো অস্ত্র সরবরাহ করে এবং সরাসরি আঘাত হেনে ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রনায়কের পতন ঘটায়। এক হিসাবে বলা হয় আরব বসন্তের ফলে মাত্র পৌনে দুই বছরে লিবিয়া, সিরিয়া, মিশর, তিউনিসিয়া, বাহরাইন ও ইয়েমেনের গণ-আন্দোলনের ফলে মোট দেশজ উৎপাদনের ক্ষতি হয়েছে দুই হাজার ৫৬ কোটি ডলার । ডিসেম্বর ২০১০ থেকে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় যে গণবিদ্রোহ ও বিক্ষোভ প্রদর্শন হচ্ছে তা ইতিহাসে নজিরবিহীন। এ পর্যন্ত আলজেরিয়া, ইয়েমেন, বাহরাইন, মিশর, ইরান, জর্ডান, লিবিয়া, মরক্কো, তিউনিসিয়ায় বড় ধরনের বিদ্রোহ হয়েছে এবং ইরাক, কুয়েত, মৌরিতানিয়া, ওমান, সৌদি-আরব, সোমালিয়া, সুদান, সিরিয়াতে ছোট আকারের ঘটনা ঘটেছে। এসব বিদ্রোহে প্রতিবাদের ভাষারূপে গণবিদ্রোহের অংশ হিসেবে হরতাল, বিক্ষোভ প্রদর্শন, জনসভা, র‍্যালি প্রভৃতি কর্মসুচী নেয়া হয়। দেশব্যাপী সাংগঠনিক কাজ, যোগাযোগ এবং রাষ্ট্রীয় প্রচারণার থেকে জনগণের মধ্যে সচেতনতা গড়ে তুলতে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলিকেও ব্যবহার করা হয় । বিভিন্ন কারণে এমন বিদ্রোহের সূচনা হয় যার মধ্যে সরকারি দুর্নীতি, স্বৈরতন্ত্র, মানবাধিকার লঙ্ঘন, বেকারত্ব এবং চরম দারিদ্র্যের অভিযোগের পাশাপাশি বিশাল যুবসমাজের অংশগ্রহণও অণুঘটকরূপে কাজ করেছে। এর পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে খাদ্যমূল্য বৃদ্ধি এবং খরার প্রকোপও বড় কারণ। ১৮ ডিসেম্বর তিউনিসিয়ায় মোহাম্মদ বোয়াজিজির পুলিশে দুর্নীতি ও দুর্ব্যবহারে প্রতিবাদে আত্মাহুতির মাধ্যমে বিদ্রোহ শুরু হয়। তিউনিসিয়ার বিপ্লব সফল হওয়ার পাশাপাশি অন্যান্য দেশেও আত্মাহুতির কারণে অস্থিরতা শুরু হয় যার ফলে আলজেরিয়া, জর্ডান, মিশর ও ইয়েমেনে বিদ্রোহ শুরু হয়। তিউনিসিয়ায় জেসমিন বিপ্লবের ফলে ১৪ জানুয়ারি শাসক জেন এল আবেদিন বেন আলির পতন ঘটে এবং তিনি সৌদি আরবে পালিয়ে যান। ২৫ জানুয়ারি থেকে মিশরে বিদ্রোহ শুরু হয় এবং ১৮ দিনব্যাপী বিদ্রোহের পরে ৩০ বছর ধরে শাসন করা প্রেসিডেন্ট মুবারক ১১ ফেব্রুয়ারি পদত্যাগ করেন। একই সাথে জর্ডানের বাদশাহ আব্দুল্লাহ নতুন প্রধানমন্ত্রীর নাম ঘোষণা করেন, ইয়েমেনের রাষ্ট্রপতি আলি আব্দুল্লাহ সালেহ ঘোষণা দেন যে তিনি ২০১৩ সালের পর আর রাষ্ট্রপতি থাকবেন না । সেই সময়ে লিবিয়ার শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে পতনের চেষ্টা করা হয় এবং সুদানের রাষ্ট্রপতি আলি আব্দুল্লাহ সালেহ ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি ২০১৫ এর পর নির্বাচনে অংশ নেবেন না । এরূপ স্বতস্ফূর্ত গণবিক্ষোভ এবং এসব দেশের ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের কারণে তা আজ গোটা বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণের কারণ

ফিরে দেখা ইয়েমেনের গণবিক্ষোভ

মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যে গণবিক্ষোভ চলছে তার ঢেউ এসে লেগেছে ওই এলাকার কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ দেশ ইয়েমেনেও। অব্যাহত গণবিক্ষোভের মুখে ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহ ঘোষণা করেছিলেন, তিনি আর দেশটির প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হবেন না। এমনকি তার পুত্রকেও এ পদে বসানোর ইচ্ছা তার নেই। প্রেসিডেন্ট সালেহ যখন এ ঘোষণা দেন তখন তিউনিসিয়া থেকে বেন আলী পলায়নের পর মিসরে গণবিদ্রোহ দানা বেঁধে উঠছিল। প্রবল গণবিক্ষোভে হোসনে মোবারকের পতনের পর বর্তমানে মিসরে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। অপরদিকে ইয়েমেনে গণবিক্ষোভ প্রবল আকার ধারণ করেছে। প্রেসিডেন্টের পক্ষ ত্যাগ করে মন্ত্রিসভার সদস্য ও এমপিরা বিরোধী পক্ষে যোগদান করছে। প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতা ও গোত্র প্রধানরা বিরোধীপক্ষকে সমর্থন দিচ্ছেন। ইয়েমেনের ভেতর ও বাইরে থেকে প্রেসিডেন্ট আলী সালেহর দীর্ঘ ৩৩ বৎসরের শাসনের কীভাবে অবসান ঘটানো যায় তা নিয়ে ইতোমধ্যে জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে। এক সময় প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহ যুক্তরাষ্ট্রের ঘোর বিরোধী ছিলেন। ১৯৭৮ সালের দিকে তিনি উত্তর ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ১৯৯০ সালের উত্তর ও দক্ষিন ইয়েমেন একীভূত হওয়ার পর পুনরায় তিনি একীভূত ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ২০০৬ সালে তিনি আবার ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। দলহীন সে নির্বাচনে তিনি ভোট কারচুপি ও জালিয়াতির মাধ্যমে জয়লাভে সমর্থ হন বলে মনে করা হয়। ইয়েমেনের এ স্বেচ্ছাচারী শাসক স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর সোভিয়েতপন্থী দক্ষিণ ইয়েমেনকে উত্তরের সাথে একীভূত করতে সমর্থ হয়েছিলেন। ইয়েমেনবাসীর আশা ছিল তার নেতৃত্বে ইয়েমেন একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত হবে। কিন্তু জনগণের সে আশা তিনি পূরণ করতে পারেননি। দুর্নীতি ও দারিদ্র্য গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে। দুর্নীতি নির্মূলের পরিবর্তে তিনি এর প্রতিবাদ বিক্ষোভকে কঠোর হস্তে দমনের চেষ্টা করছেন। তিনি নিজ দেশের প্রতিবাদী বিক্ষোভকারীদের দমনের জন্য অন্য দেশের সৈন্য ডেকে আনছেন। বিক্ষোভ দমনে বিমান হামলা চালিয়েছেন। আর স্বীয় ক্ষমতা স্থায়ী করতে আমেরিকান সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে সামিল হচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও তার দোসরদের সন্তুষ্ট করে নিজের ক্ষমতাকে নিরাপদ করতে চেয়েছেন ঠিকই কিন্তু ইয়েমেনিদের ক্ষোভ দূরীভূত করার জন্য প্রেসিডেন্ট সালেহ তেমন কিছুই করেননি। মিসর ও তিউনিসিয়া থেকে ইয়েমেনের অবস্থা কিছু দিক থেকে আলাদা আবার কিছু কিছু দিকে সাদৃশ্য রয়েছে। ইয়েমেনের মোট জনসংখ্যা প্রায় দুই কোটি ৮০ লাখ এবং মোট জনসংখ্যার ৫৪ শতাংশ সুন্নি ও ৪৬ শতাংশ হলো শিয়া। জনবিন্যাসের এ বাস্তবতার নিরিখে সালেহবিরোধী বিক্ষোভ একেবারে প্রবল আকার ধারণ করেনি। তবে বাহরাইনের মতো শিয়ারা সরকারের বিপক্ষে আর সুন্নিরা সরকারের পক্ষে এমনটিও নয়। অধিকতর স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের দাবিতে যদি দু’পক্ষ একসাথে বিক্ষোভ শুরু করে তাহলে প্রেসিডেন্ট সালেহর পতন অনিবার্য হয়ে পড়বে। সালেহর স্বেচ্ছাচারী শাসনই গণবিদ্রোহের একমাত্র কারণ নয়। মধ্যপ্রাচ্যের সর্বাধিক জনবহুল এ দেশে প্রতি বছর সাত লাখ করে মানুষ বাড়ছে। জনসংখ্যার বড় অংশই কর্মবাজারের উপযোগী। তরুণ ইয়েমেনির সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। যাদের অধিকাংশই বেকার। ইয়েমেনের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তরিত করার কোনো পদক্ষেপ দেশটিতে নেয়া হয়নি। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী ৩৫ শতাংশ ইয়েমেনি বেকার। দেশটির জাতীয় আয়ের ২৫ শতাংশ আসে তেল রাজস্ব থেকে। কিন্তু এ সম্পদের সুষম কোনো ব্যবহার হয়নি। এ বৈষম্যকে কেন্দ্র করে গোত্রগুলোর মধ্যে মতবিরোধও রয়েছে। তেল রাজস্ব থেকে আয়কৃত অর্থ দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধ ও কর্মসংস্থানের জন্য কাজে লাগাতে পারেনি সরকার। উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় ইয়েমেন ইরাকের সাদ্দামকে সমর্থন করায় সৌদি আরবের সাথে একসময় সম্পর্কের অবনতি ঘটেছিল। ইয়েমেনে কর্মহীন ও দারিদ্রে্যর সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ছে সর্বত্র। নজিরবিহীন গোত্রও বর্ণগত বৈষম্যের কারণে দেশটির কোনো কোনো স্থানে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ছে। এ বিদ্রোহে ইসরাইলের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। এভাবে অন্যান্য আরব দেশগুলোর মতো ইয়েমেনেও ক্ষোভ দানা বেঁধে উঠতে থাকে। তিউনিসিয়ার বিপ্লব, মিসরে হোসনে মোবারকের পতন এ ক্ষোভকে আরো উদ্দীপ্ত করে তোলে। প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহর বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভ জোরদার হওয়ার সাথে সাথে রাজধানী সানায় আতঙ্ক ও উত্তেজনা বেড়ে যায় । মাঝে মধ্যে সরকার পক্ষ ও বিরোধীপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষও ঘটে চলেছে । পশ্চিমা দেশগুলোও আন্তর্জাতিক সংস্থা তাদের কূটনৈতিক কর্মী ও জনবলকে সরিয়ে নিচ্ছে। ব্রিটিশ সরকার সেদেশের নাগরিকদের পর্যাপ্ত খাদ্য, পানি মজুদ রাখা ও রাস্তার বাইরে না আসার পরামর্শ দিয়েছে। অস্ট্রেলিয়া ও কানাডা সরকার তাদের দেশের নাগরিকদের দ্রুত ইয়েমেন ত্যাগের নির্দেশ দেয় । প্রতিদিন ইয়েমেনি তরুণরা ব্যাপকভাবে টায়ার পুড়িয়ে ও ঢিল ছুঁড়ে সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করছে। এতদিন প্রেসিডেন্ট সালেহ প্রভাবশালী গোত্র নেতাদের নানা ধরনের সুযোগ সুবিধা দিয়ে ভারসাম্য আনার চেষ্টা করে আসছিলেন। কিন্তু বর্তমানে প্রভাবশালী গোত্র নেতা, এমনকি প্রেসিডেন্ট সালেহর কোনো কোনো সহযোগী বিক্ষোভকারীদের সাথে যোগ দিচ্ছেন। ২০১১ সালের শেষের দিকে প্রেসিডেন্ট সালেহর ক্ষমতা ছাড়ার কথা থাকলেও তিনি তার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছেন বলে ২রা মার্চ গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। এতে বিক্ষোভাকারীরা আরো বিক্ষব্ধ হয়ে ওঠে। বেসামরিক লোকদের হত্যা এবং তাদের দাবি আদায়ে রাজপথে অব্যাহত মিছিলে প্রেসিডেন্ট সালেহর ভাবমূর্তি ও কর্তৃত্ব দুটোকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। বিক্ষোভকারীরা প্রেসিডেন্ট সালেহর পতন না হওয়া পর্যন্ত রাজপথ ছাড়বেন না বলে ঘোষণা দিয়েছে । তবে তিউনিসিয়া ও মিসরে বিক্ষোভে যে ব্যাপক অংশগ্রহণ ছিল ইয়েমেনে বিক্ষোভে এখনো ততোটা দেখা যায়নি। সেকুলার ও ইসলামপন্থীরা অভিন্ন প্লাটফর্মে জোরদারভাবে ঐক্যবদ্ধ হতে পারেনি। প্রেসিডেন্ট সালেহর একসময়ের মিত্র প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতা আব্দুল মজিদ আলা জিন্দানী ২০১১ সালের ১ মার্চের সরকার বিরোধী বিক্ষোভ সমাবেশে যোগ দিয়েছেন। তিনি ইয়েমেনে ইসলামী খেলাফত প্রতিষ্ঠার ডাক দিয়েছেন। এই প্রসঙ্গে ইয়েমেনের বিশিষ্ট সাংবাদিক নাসের আন্দাবি বলেছেন, ‘নেতারা অনেকে রাস্তায় বলছেন এককথা, আর চারি দেয়ালের ভেতরে বলছে অন্যকথা। নেতাদের মধ্যে অনেকে এখন সালেহর সাথে সকল সম্পর্কের অবসান ঘটাতে তৈরি।’ ইয়েমেনে এখনো প্রধান ও ধর্মীয় নেতারা ক্ষামতার একটা বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। ইয়েমেন ধনসম্পদ ও যোগযোগের ক্ষেত্রে প্রভাবশালী গোত্রগুলোর মধ্যে আল আহমার অন্যতম। আল আহমারকে ক্ষমতার পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর বলে মনে করা হচ্ছে। এ গোত্রের নেতা শেখ আবদুল্লাহ আল আহমার সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের সমর্থন করছেন । ২০১১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি সরকারি দলের অন্যতম নেতা হোসেন সরকারের সাথে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করে তার গোত্রের দশ হাজার লোক নিয়ে বিরোধী শিবিরে যোগ দিয়েছিলেন । তখন ইয়েমেনের লোহিত সাগর তীরবর্তী নগরী হুদায়দায় সরকার ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছিলো । তাতে প্রায় দুইশত লোক আহত ও কিছু সংখ্যক লোক নিহত হয় । পুলিশ বিক্ষোবকারিদের উপর বিভিন্নভাবে হামলা চালায় । দিন যতোই গড়াচ্ছে ততোই প্রেসিডেন্ট সালেহর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ আরো জোরদার হতে থাকে । রাজধানীর সানাসহ বড় বড় শহরগুলোতে সহিংসতার বিস্তার ঘটছে। জনগণের মধ্যে আতঙ্ক ও উত্তেজনা বাড়ছে। প্রেসিডেন্ট সালেহ শান্তিপূর্ণ প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা ছেড়ে দিলেও ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ কী হবে তা এ মুহূর্তে বলা মুশকিল। সালেহ মনোনীত করে তার হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেবেন যিনি ইয়েমেনি জনগণের অধিকার ফিরিয়ে দেবেন এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবেন। বিক্ষোভকারীরা এমনটিই আশা করেন। তবে তেমন লোক পাওয়া সেখানে বেশ খানিকটা দুষ্কর। ইয়েমেনে এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন জনগণের অর্থনৈতিক বঞ্চনার অবসান ঘটানো। বর্তমানে সরকারের হাতে তেলের বাড়তি মূল্যের যে রাজস্ব রয়েছে তা থেকে ভর্তূকি দিয়ে খাদ্য ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রীর বাড়তি মূল্য স্বাভাবিক রাখা বেশ কঠিন। বেকারদের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেয়ার মতো স্বল্পমেয়াদি কোনো ব্যবস্থায়ও সরকারের সামনে নেই। উদ্বেগের বিষয় হলো মিসরের মতো ইয়েসেনের সেনাবাহিনী ততোটা সুসংগঠিত নয়। অন্তর্বতী সময়ে শক্তভাবে হাল ধরে দেশকে অনিবার্য পরিবর্তনের পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। তাই ইয়েমেনে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও শান্তিশৃক্মখলা ফিরিয়ে আনতে হলে এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সরকার ও বিরোধী পক্ষকে আলোচনায় বসে সমস্যার সমাধানের পথ খুঁজে বের করা। নইলে ইয়েমেনের রাজনৈতিক সংকট গভীর থেকে আরো গভীরতর হবে এবং দেশটিকে কঠিন সংঘাতের পথে ঠেলে দিতে পারে বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে অনেকে মনে করেন ।

ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ

চলমান সংঘাতময় পরিস্থিতি আজ গৃহযুদ্ধের রূপ ধারন করেছে । এটি দেশটিকে নিয়ে যাচ্ছে এক অজানা ভবিষ্যতের দিকে । গৃহযুদ্ধ এক ধরনের যুদ্ধ যা নির্দিষ্ট কোন রাষ্ট্র বা দেশের অভ্যন্তরে সাংগঠনিকভাবে দুই বা ততোধিক দল সরাসরি যুদ্ধে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে। সাধারণ অর্থে গৃহযুদ্ধের ফলে দু’টি স্বাধীন দেশ সৃষ্ট হয় যা পূর্বে একীভূত দেশের নিয়ন্ত্রণে ছিল । এক পক্ষ কর্তৃক দেশ বা এলাকা নিয়ন্ত্রণ, অঞ্চল বা এলাকার স্বাধীনতা ঘোষণা অথবা সরকারের নীতি-নির্ধারণে পরিবর্তনের জন্য চাপ প্রয়োগ এ যুদ্ধের প্রধান উদ্দেশ্য । ইয়মেনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যকার চিত্রও ঠিক একই রকম ।

বিভিন্ন কারণে গৃহযুদ্ধ সংঘটিত হলেও মূলত দু’টি প্রধান কারণ রয়েছে। রাষ্ট্রের নেতৃত্ব গ্রহণ কিংবা দেশ পরিচালনা পদ্ধতি বিষয়ে বিভিন্ন দলের মধ্যে মতানৈক্যে ঘটলে গৃহযুদ্ধ ঘটে। দু’টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে কোন একটি দল যদি নির্বাচনের ফলাফল মেনে না নেয় কিংবা দু’দলের মধ্যে কোনরূপ চুক্তি সম্পাদন না হয়, তাহলেও তা গৃহযুদ্ধের সূচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এক দলভূক্ত জনগোষ্ঠী ভাষা, সংস্কৃতি ইত্যাদিতে ভিন্নতাজনিত কারণে যদি দেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ হতে ইচ্ছা প্রকাশ না করে তাহলেও গৃহযুদ্ধ হতে পারে। এ ধরনের যুদ্ধ বিচ্ছিন্নতাবাদ নামে পরিচিত। তখন তারা দেশ বিভাজন করে নতুন একটি স্বাধীন দেশের জন্যে গৃহযুদ্ধে সম্পৃক্ত হয়। খুব কমসংখ্যক জাতীয় নেতৃবৃন্দ এতে অংশ নিতে পারেন। অধিকাংশ জাতীয় নেতা-ই দেশ বিভাজনে অংশ নিতে চান না যার ফলশ্রুতিতে অনিবার্য্যভাবে তা গৃহযুদ্ধের আকারে মোড় নেয় । কখনো কখনো দলভূক্ত জনগোষ্ঠী সম্পূর্ণ নতুন দেশ তৈরীতে আগ্রহী নন। কিন্তু তারা তাদের অধিকারবোধ ও দাবী-দাওয়া আদায়ের লক্ষ্যে এ সংক্রান্ত বিষয়ে দেশ পরিচালনা পদ্ধতিতে সম্পৃক্ত হতে চান। এ ধরনের গৃহযুদ্ধ মূলত দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন আঞ্চলিক দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ । গৃহযুদ্ধ উচ্চ পর্যায়ের সংঘর্ষে রূপ নেয় যাতে প্রায়শঃই অনুমোদনকৃত, প্রশিক্ষিত, সংগঠিত, বৃহৎ আকৃতির নিয়মিত সামরিক বাহিনী জড়িয়ে পড়ে । আর আমনটিই চলছে ইয়মেনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দলগুলি ও সৌদি এবং সৌদি জোটের দেশগুলির মধ্যে ।

ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে কে কার বিরুদ্ধে লড়াই করছে – ২০১৫ সালের মার্চ থেকে গৃহযুদ্ধে চরম বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র দেশ ইয়েমেন। প্রেসিডেন্ট মনসুর হাদির সৌদি আর সৌদি জোট এবং পশ্চিমা সমর্থিত সরকার এবং ইরান সমর্থিত শিয়া হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর মধ্যে মূলত চলছে এই লড়াই । এখন পর্যন্ত প্রাণ গেছে ৯০০০ লোকের, জখম হয়েছে প্রায় ৫৩০০০ মানুষ । এই তালিকায় সর্বশেষ যোগ হয়েছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট আলি আব্দুল্লাহ সালেহ যিনি হুতি বিদ্রোহীদের সাথে কোয়ালিশনের অংশ ছিলেন। কিন্তু অতি সম্প্রতি হুতিদের সাথে তার সমর্থকদের বিরোধ তৈরি হয় ।

কীভাবে শুরু হলো এই গৃহযুদ্ধ – লড়াইয়ের সূচনা ২০১১ সালে ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে বিরোধ থেকে। বর্তমান সৌদি সমর্থিত সরকারের প্রেসিডেন্ট মি হাদি তখনকার প্রেসিডেন্ট মি সালেহর ডেপুটি ছিলেন। স্থিতিশীলতার স্বার্থে মীমাংসা অনুযায়ী মি সালেহ মি হাদির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। কিন্তু দক্ষিণে আল কায়দার তৎপরতা থেকে শুরু করে বেকারত্ব এবং মি সালেহর প্রতি কিছু সেনা কর্মকর্তার অব্যাহত আনুগত্যের কারণে মি হাদি ক্ষমতা নিয়ে সমস্যার মধ্যে পড়েন । সেই দুর্বলতার সুযোগ নেয় ইয়েমেনের সংখ্যালঘু জাইদি শিয়া মুসলিম মিলিশিয়া বাহিনী যারা হুতি নামে পরিচিত। তারা ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলীয় সাদা প্রদেশ এবং আশপাশের বেশ কিছু অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। মি হাদির সরকারের প্রতি বিরক্ত অনেক সুন্নিও সেসময় হুতিদের সমর্থন দেয়। এরপর ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে হুতি বিদ্রোহীরা রাজধানী সানায় ঢুকে পড়ে। ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে তারা সানার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় এবং প্রেসিডেন্ট হাদি এবং তার সরকারের সদস্যদের কার্যত গৃহবন্দী করে ফেলে। প্রেসিডেন্ট হাদি পালিয়ে দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দর নগরী এডেনে পালিয়ে যান। এরপর সাবেক প্রেসিডেন্ট সালেহর সমর্থকদের সাথে জোট বেঁধে হুতি মিলিশিয়ারা পুরো ইয়েমেনের নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেয়। ২০১৫ সালের মার্চে মি হাদি দেশ থেকে পালিয়ে যান। শিয়া ইরান পাশের দেশে হাত বাড়াচ্ছে – এই আশঙ্কায় সৌদি আরব সাতটি সুন্নি আরব দেশের সাথে মিলে হুতিদের ওপর বিমান হামলা শুরু করে। অস্ত্র এবং গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে তাদের সমর্থন যোগায় যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন এবং ফ্রান্স ।

ইয়েমেনের মানবিক বিপর্যয় ও পরিনাম

সৌদি জোটের হামলা আর গৃহযুদ্ধের কারনে দেশটিতে দেখা দিয়েছে চরম মানবিক বিপর্যয় । ভেঙে পড়েছে দেশটির সকল অর্থনৈতিক কাঠামো । দেশের মানুষ বিবিশিখাময় পরিস্থিতে তাদের দিন পার করছে । যে যেই কারনেই যুদ্ধ করুক না কেন তাতে ক্ষতি শুধু নিরিহ সাধারণ মানুষদের আর ধ্বংস হচ্ছে দেশের সামষ্টিক পরিস্থিতি । ৩ বছরের বেশী সময় ধরে চলমান এই যুদ্ধে প্রায় ৯০০০ হাজারের বেশী মানুষ নিহত হয়েছে । আহত হয়েছে প্রায় ৫৩০০০ হাজারেরমত মানুষ । বাস্তুচ্যুত হয়েছে প্রায় ২০ লাখেরমত মানুষ । জরুরী সাহায্য প্রয়োজন ২৫ লাখ মানুষের । ১০ লাখেরমত মানুষ ভুগছে অনাহারে । কলেরায় আক্রান্ত প্রায় ৯,৫০,০০০ এরমত মানুষ । অপুষ্টি আর চিকিৎসার অভাবে মারা গেছে আরো অনেক মানুষ । এই সবই হচ্ছে যুদ্ধ চলাকালিন সময় ও তার পরবর্তী সময়ের প্রভাব । এর শেষ কোথায় তা এখনো বলা যাচ্ছে না । ইয়েমেন তথা মধ্যপ্রাচ্যের অবস্থা বর্তমানে মধ্য যুগের ক্রুসেডারদেরমত । ইয়েমেনের এই সংকটময় পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম দেশগুলির জন্য অত্যন্ত চিন্তার বিষয় । বাস্তুচ্যুত ও উদ্বাস্তু মানুষেরা তাদের দিন কাটাচ্ছে নিরাপত্তাহীনভাবে খোলা আকাশের নিচে , আশ্রয় নিচ্ছে পার্শ্ববর্তী দেশগুলিতে । সৌদি ও তাদের জোটভুক্ত দেশগুলি সেখানে সাহায্য পোঁছানোর সুযোগ দিচ্ছে না । করছে অনবরত হামলা আর অবরোধ । এই জডিয়ে আছে অনেকগুলি প্রত্যক্ষ ও পরক্ষ বিষয় । এতে রাজনৈতিক , কূটনৈতিক বিষয় যেমন রয়েছে তেমন রয়েছে অর্থনৈতিক বিষয়ও । সৌদি ও তাদের জোটভুক্ত দেশগুলি যখন যুদ্ধে লিপ্ত তখন তাদের পর্যবেক্ষণ ও সাহায্যের জন্য সাথে যুক্ত আছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশ যুক্তরাজ্য আর ফ্রান্স ।
ইয়েমেনের অবস্থানও কৌশলগত-ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাব আল-মান্দাব প্রণালি ইয়েমেনের লাগোয়া। সরু এই জলপথটি লোহিত সাগর এবং গাল্ফ অব এডেনকে সংযুক্ত করেছে। বিশ্বের জ্বালানি তেল সরবরাহের প্রধান একটি রুট এই জলপথ । যা সৌদিআরব ও অন্যান্য জঙ্গি উগ্রবাদী দলগুলোর দৃষ্টি আকর্ষক । এই সংঘাত যদি আরও চলমান থাকে এবং দীর্ঘ হয় তাহলে এখানে পশ্চিমা শক্তিধর দেখগুলির সরাসরি আক্রমনের সম্ভাবনা আছে । এই যুদ্ধকে কেন্দ্র করে বিক্ষিপ্তভাবে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ছে আইএস, আলকায়দা এরমত উগ্রবাদী জঙ্গি দলগুলি । উগ্রবাদী দলগুলি অস্থির পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সক্ক্রিয় হচ্ছে কখনো পক্ষ, বিপক্ষ দলগুলির সাথে বা নিজেরশভাবে । যা বিপদজনক । যা আগুনে তেলে ঢালারমতন ।

এই হচ্ছে ইয়েমেনে আগ্রাসন বা সংঘাত চলমান সময় থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত সার্বিক চিত্র । মানবিক বিপর্যয় ও যুদ্ধ বন্ধের জন্য ইয়েমেনে দ্রুতু যুদ্ধ বিরতি ও শান্তি চুক্তির প্রয়োজন । এখানে জাতিসঙ্ঘ ও ওআইসি এর শক্ত ও জোরাল পদক্ষেপ প্রয়োজন । যা মুসলিম দেশগুলি ও মধ্যপ্রাচ্যের মঙ্গোলের হবে । মুসলিম দেশগুলি যদি পরস্পর নিজেদের মধ্যে মানবিকতার অমানবিক ব্যবহার করে সংঘাতে লিপ্ত থাকে তার সুযোগ নিবে পশ্চিমা শক্তিধর দেশগুলি । এই সুদূর প্রসারী চিন্তাগুলি নিজেদের মাঝে থাকা উচিত । তবে সব শেষে যাই করা হোক না কেন , সবার আগে মানবিক ও মানবিকতাকে বিবেচনা করে মূল্যায়ন করা উচিত । তারই পরিপ্রেক্ষিতে ইয়েমেনের উপর থেকে সকল প্রকার আগ্রাসন ও অবরোধ বন্ধ করা হোক ।

১৯ মে ২০১৮/সত্যের সৈনিক/সুলতান মাহমুদ

Leave A Reply

Your email address will not be published.