অনলাইন বাংলা সংবাদ পত্র

পঁচিশে মার্চ ছিল বাঙালি জাতির ভয়াবহ কালরাত -এম এ মোতালিব

বাঙালি জাতির জন্য ভয়ংকর রাত ছিল ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের সেই কালরাত। ক্ষমতালিপ্সু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী তাদের বর্বরতার চরম সীমা লঙ্ঘন করেছিল সেই রাতে। তাদের ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখতে সেই রাতে তারা নিরীহ-নিরস্ত্র বাঙালি জাতির ওপর অতর্কিত নিধনযজ্ঞ চালায়। এটা ছিল বিশ্বসভ্যতার এক কলঙ্কজনক জঘন্যতম গণহত্যার সূচনা, যা সারা বিশ্ব অবলোকন করেছে। অস্ট্রেলিয়ার ‘সিডনি মর্নিং হেরাল্ড’ পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, শুধু পঁচিশে মার্চ রাতেই বাংলাদেশে প্রায় এক লাখ মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল, যা গণহত্যার ইতিহাসে এক জঘন্যতম ভয়াবহ ঘটনা। পরবর্তী ৯ মাসে একটি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জন্য ৩০ লাখ নিরপরাধ নারী-পুরুষ-শিশুকে হত্যার মধ্য দিয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা পূর্ণতা দিয়েছিল সেই বর্বর ইতিহাসকে।
মার্কিন সাংবাদিক রবার্ট পেইন ২৫ মার্চ সেই কালরাতের ভয়াবহতা বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছেন, সেই রাতে ৭ হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়, আর গ্রেপ্তার করা হয় ৩ হাজার ব্যক্তিকে। পূর্ব পাকিস্তানজুড়ে পাকসেনারা বাড়িয়ে চলল মৃতের সংখ্যা। জ্বালাতে লাগল ঘর-বাড়ি, দোকান-পাট। লুট আর ধ্বংস যেন তাদের নেশায় পরিণত হলো। রাস্তায় রাস্তায় বেঘরে পড়ে থাকা মৃতদেহগুলো কাক-শকুন আর শেয়ালের খাবারে পরিণত হলো। তখন যেন বাংলাদেশ হয়ে উঠল শকুনতাড়িত শ্মশান ভূমি। সে কি ভয়ংকর দৃশ্য!
শুধু তা-ই নয়, বর্বরোচিত এই গণহত্যার স্বীকৃতি খোদ পাকিস্তান সরকার প্রকাশিত দলিলেও রয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানের সংকট সম্পর্কে যে শ্বেতপত্র পাকিস্তানি সরকার মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে প্রকাশ করেছিল, তাতে বলা হয়, ‘১৯৭১ সালের পয়লা মার্চ থেকে ২৫ মার্চ রাত পর্যন্ত এক লাখেরও বেশি মানুষের জীবননাশ হয়েছিল।’
তারা এতটাই ক্ষমতালোভী হয়েছিল যে ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে জয়লাভ করা সত্তে¡ও আওয়ামী লীগের কাছে পাকিস্তানি জান্তা ক্ষমতা হস্তান্তর করেনি। ফলে সৃষ্ট রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনের প্রক্রিয়া চলাকালে পাকিস্তানি সেনারা কুখ্যাত ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নাম দিয়ে নিরীহ বাঙালি বেসামরিক লোকজনের ওপর অতর্কিত গণহত্যা চালায়। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল আওয়ামী লীগসহ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতা-কর্মীসহ সর্বস্তরের সচেতন নাগরিককে নির্বিচারে হত্যা করা। পাক হায়েনাদের বর্বরতা থেকে রক্ষা পায়নি রোকেয়া হলের ছাত্রীরাও। ওই সময় ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব ও জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা, অধ্যাপক সন্তোষ ভট্টাচার্য, ড. মনিরুজ্জামানসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের ৯ জন শিক্ষককে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়। হত্যা করা হয় বুদ্ধিজীবীদের। ঢাবির জগন্নাথ হলে চলে নৃশংসতম হত্যার সবচেয়ে বড় ঘটনা। বিশিষ্ট নজরুল গবেষক ও বাংলা একাডেমির সাবেক পরিচালক অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম থাকতেন বিশ্ববিদ্যালয়ের নীলক্ষেত আবাসনের ২৪নং বাড়িতে। ওই বাড়ির নিচে দুপায়ে গুলিবিদ্ধ দুই মা তাদের শিশু সন্তানকে নিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাদের তাজা রক্তে সিঁড়ি ভেসে যাচ্ছিল। পাক হায়েনারা ভেবেছিল অন্য কোনো দল হয়তো অপারেশন শেষ করে গেছে। তাই তারা আর ওই বাড়িতে ঢোকেনি। সে কারণেই বেঁচে যান অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ড. সুলতান মাহমুদ রানার এক লেখা থেকে জানা যায়, ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় গণহত্যার নির্দেশ দিয়ে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া চুপিসারে করাচির পথে ঢাকা ত্যাগ করেন। এই নির্দেশের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘অপারেশন সার্চলাইট’। এটি বাঙালিদের জন্য ছিল একটি ‘কালরাত্রি’। কারণ সৈন্যরা মধ্যরাতের পর থেকেই নির্বিচারে হাজার হাজার নিরীহ মানুষকে হত্যা করতে আরম্ভ করেছিল। ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামের এই পরিকল্পনাটি কার্যকর করার দায়িত্ব গ্রহণ করেন ইস্টার্ন কমান্ডের কমান্ডার টিক্কা খান। তারই নির্দেশে ২৫ মার্চের মধ্যরাতের পর অর্থাৎ ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে পাকবাহিনী বাংলাদেশের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ওই রাতে শুধু সাধারণ মানুষের ওপর নয়, প্রচÐ আক্রমণ চালানো হয় বাঙালি নিরাপত্তাকর্মীদের ওপরও। সৈন্যবাহিনীর বাঙালি সদস্য, ইপিআর ও পুলিশদের খতম করা ছিল পশ্চিমাদের একটি বড় লক্ষ্য। ঢাকার রাজারবাগ ও পিলখানায় এবং চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও যশোর ক্যান্টনমেন্টে পাকিস্তানি বাহিনী যথাক্রমে বাঙালি পুলিশ, ইপিআর এবং ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট (ইবিআর)-এর সৈন্যদের গণহারে হত্যা করতে শুরু করে। এই অপারেশনের মূল লক্ষ্য ছিল গণহত্যা এবং অগ্নিসংযোগ। প্রথমেই পুরো ঢাকা শহরে হামলা চালানো হয়। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের হত্যা করে বিভিন্ন জায়গায় গণকবর দেওয়া হয়। এতটুকুতেই ক্ষান্ত হয়নি তারা। ওই রাতে অনেক শিক্ষককে হত্যা করা হয়েছিল নিষ্ঠুরভাবে। এ ছাড়া ওই রাতে ইকবাল হল (বর্তমান সার্জেন্ট জহুরুল হক হল), জগন্নাথ হল, ফজলুল হক হল, ঢাকা হল, এসএম হলের অনেক আবাসিক ছাত্রকে হত্যা করা হয়। কী যে বীভৎস গণহত্যা চালিয়েছিল তারা, যার জঘন্যতম নজীর ইতিহাসে দ্বিতীয়টি আছে বলে মনে হয় না।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের সেই কালরাতে পাকিস্তানের সামরিকজান্তা ঢাকাসহ সারা দেশে বর্বরোচিত গণহত্যা শুরু করলে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পিপিআরের ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে প্রেরিত বার্তায় আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করেন। আর ওই সময়েই বাঙালির প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু হয়, শুরু হয় স্বাধীনতাযুদ্ধ বা মুক্তিযুদ্ধ। বঙ্গবন্ধুর সেই তেজদীপ্ত ডাকে নিরীহ বাঙালি যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে পাক হায়েনাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বীরবাঙালি পাকিস্তানি হায়েনাদের কবল থেকে ছিনিয়ে আনে স্বাধীনতার লাল সূর্য। স্বাধীন হয় বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ।
লেখক : কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

[email protected]

২৫ মার্চ ২০১৮/সত্যের সৈনিক/সুলতান মাহমুদ

Leave A Reply

Your email address will not be published.