অনলাইন বাংলা সংবাদ পত্র

ভেজাল প্রতিরোধে কঠোর ব্যবস্থা এখনই প্রয়োজন -এম এ মোতালিব

আত্মশুদ্ধির মাস হলো রমজান। এ মাসকে সংযমের মাস; ত্যাগের মাস; লোভ-লালসা, পাপ-পঙ্কিলতা, হিংসা-বিদ্বেষ, অসাধু-অসততা, অহংকার-অহমিকা পরিহার করে নিজেকে পরিশুদ্ধ করার মাস। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশের এক শ্রেণির মুনাফালোভী অসাধু ব্যবসায়ী এই রমজান মাসের প্রতীক্ষায় থাকে অসদোপায়ে তাদের মুনাফার পাহাড় গড়ে তোলার জন্য। তাদের উদ্দেশ্যই থাকে কিভাবে ভোক্তা সাধারণ ও রোজাদারদের ঠকিয়ে, বিভিন্ন পণ্যে ভেজাল মিশিয়ে তাদের সাথে প্রতারণা করে ব্যবসার আড়ালে টাকার পাহাড় গড়া যায়। তারা একবারও ভাবে না, তাদের প্রতারণার ফাঁদে পড়ে অবর্ণনীয় ভোগান্তির শিকার হয় সাধারণ ভোক্তা শ্রেণি অসংখ্য রোজাদার ব্যক্তি। এটাকেই কি রোজার মাসের সংযম বলা হয়! এটাই কি রোজার আদর্শ! আরো উদ্বেগের বিষয় হলো এ মাসে সংযম ও সদাচারের কথা জোরেশোরে নানাভাবে বলা হলেও এই মাসেই বেশি দেখা যায় ধোঁকা, প্রতারণা, অনিয়ম, অসংযম ও অসততা। অধিকাংশ ব্যবসায়ী এ মাসকে চুটিয়ে টাকা কামানোর মাস হিসেবে ধরে নিয়ে ব্যবসার আড়ালে ভোক্তাদের পকেট কাটায় ব্যস্ত থাকে। ব্যবসার নামে নানামুখী প্রতারণা, পণ্যে ভেজাল দেওয়া, কৃত্রিম উপায়ে পণ্যমূল্য অস্বাভাবিক বৃদ্ধি করে ভোক্তা-রোজাদারদের সীমাহীন দুর্ভোগে মধ্যে ঠেলে দেওয়াই যেন তাদের প্রধান কাজ। স্বীয় স্বার্থ চরিতার্থে হেন নিকৃষ্ট কাজ নেই যা তারা করে না। ভেজাল সেমাই তৈরি, মসলায় ভুসি-ইটের গুঁড়া মেশানো, দুধে ফরমালিন মেশানো, মুড়িতে রাসায়নিক দ্রব্যের মিশ্রণ, তরমুজে বিষাক্ত রং মেশানো, আনারস, আপেল, আমসহ প্রতিটি মৌসুমি ফলই যেন বিষে জর্জরিত। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো সরকারের ভেজালবিরোধী অভিযানে ভেজাল পণ্য উৎপাদনকারীরা ধরা পড়লেও ওদের নামমাত্র জরিমানা করে ছেড়ে দেওয়া হয়। ফলে ভেজাল কারবার বন্ধ তো হয়-ই না; বরং আরো ফুলে-ফেঁপে ওঠে এর কলেবর বেড়ে যায়। খাদ্যদ্রব্যে ভেজালকারীরা জঘন্য অপকর্ম ও মানবঘাতী কর্মকাণ্ডে নিজেদের আপাদমস্তক নিমজ্জিত রাখলেও ওদের দৃষ্টান্তমূলক কোনো শাস্তির আওতায় আনা যায় না। গুরু অপরাধে লঘু শাস্তির কারণে বিএসটিআই ও পুলিশ প্রশাসনের ভেজালবিরোধী অভিযানে তেমন সাফল্য আসে না। বিক্ষিপ্তভাবে ঝটিকা অভিযান চলা সত্ত্বেও ভেজাল পণ্য উৎপাদনকারীরা আইনি দুর্বলতায় প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার সুযোগে এবং জন-অসচেতনতার কারণে বারবার পার পেয়ে যায়। তিলে তিলে আবালবৃদ্ধ-বনিতার জীবন সংহারকারী এসব নিকৃষ্ট অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর কোনো ব্যবস্থা দৃশ্যমান হয় না কখনোই।
খাদ্যপণ্য ভেজাল করা, ব্যবসায় অসততা ও পণ্যের অযৌক্তিক দাম বৃদ্ধির বিরুদ্ধে ইসলামী নির্দেশনা অত্যন্ত কঠোর ও বাস্তবসম্মত। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা ভালো পণ্য দেখিয়ে নিম্নমানের পণ্য বিক্রি করো না।’ পণ্যের সঠিক গুণাগুণ তুলে ধরে ভোক্তার ইচ্ছা ও বিবেচনা অনুযায়ী পণ্য বেচাকেনা করার সুস্পষ্ট তাগিদ দিয়েছেন প্রিয় নবী (সা.)। এ নির্দেশনা লঙ্ঘিত হলে ব্যবসায়ীদের দুনিয়া ও আখিরাতে কঠিন শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে বলে মহানবী (সা.) দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন। পণ্যের সঠিক মান ও গুণাগুণ নিশ্চিত করার যে তাগিদ দেওয়া হয়েছে তাই মূলত পণ্যে ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড একটি আঘাত। সঠিক গুণ-মান দেখে কেনা ও পণ্যের ভালো-মন্দ ক্রেতাকে জানানোই ইসলামের ব্যবসানীতির অপরিহার্য একটি দিক। পণ্য উৎপাদনকারী ও ভোক্তারা এদিকে দৃষ্টি দিলে ভেজাল পণ্যের বেচা-কেনা সহজেই বন্ধ হয়ে যায়। অন্যদিকে ওজনে কম দেওয়া, পরিমাপে হেরফের করাও মারাত্মক অপরাধ। কুরআন মজিদে আল্লাহ পাক বলেন, ‘তোমরা ওজনে কম দিয়ো না।’
হাদিস শরিফে মহানবী (সা.) এক মুসলমানের প্রতি অন্য মুসলমানের হক বা অধিকারের যে নির্দেশনা পেশ করেছেন তার মধ্যে একটি হচ্ছে নিজের জন্য যা ভালো ও কল্যাণকর মনে করা হয়, অন্যের জন্যও অনুরূপ ভালো ও কল্যাণ বস্তু প্রত্যাশা করা। কিন্তু এদিকে কারো কোনো দৃষ্টিপাত নেই। ফলে একদিকে তারা অন্যকে ঠকাচ্ছে, অন্যদিকে নিজেও ঠকছে, প্রতারিত হচ্ছে। এতে অবস্থা হয়ে ওঠে আরো জটিল ও ভয়াবহ। অর্থাৎ যে ব্যবসায়ী পণ্যে ভেজাল মিশিয়ে খাদ্যদ্রব্যকে বিষাক্ত ও অখাদ্য বস্তুতে পরিণত করছে, নিশ্চয়ই ওই লোকটিও অনুরূপ পণ্য বাজার থেকে কিনে খাচ্ছে। যেমন কেউ ভেজাল ঘি বানায়, ভেজাল সেমাই তৈরির সঙ্গে জড়িত। মসলাদ্রব্যে সে ভুসি বা ইটের গুঁড়া মিশিয়ে যাচ্ছে অবিরত। এ ধরনের ভেজাল খাদ্যপণ্য তৈরি ও বাজারজাত করে সে দুহাতে টাকা উপার্জনে হয়তো লিপ্ত। কিন্তু যে লোকটি ভেজাল পণ্যের ব্যবসা করছে, সেও তো ঘি, সেমাই, মসলাদ্রব্য খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করছে। সে কি নিস্তার পাবে! নিজের উৎপাদিত ভেজাল খাদ্য যদিও সে নিজে খায় না, অন্যকে খাওয়ায়। একইভাবে ওই লোকটির মতো অন্য দশজন ব্যবসায়ীও যদি এ ধরনের ভেজাল পণ্যের ব্যবসায় জড়িয়ে যায় তাহলে ভেজালকারী ব্যক্তি নিজের জন্য ভালো মানের সঠিক পণ্য ইচ্ছা করলেও বাজারে খুঁজে পাবে না। কারণ তার মতো অনেকেই ভেজাল পণ্য বাজারজাতে অভ্যস্ত। এ জন্য ভেজালের শিকার হওয়ার আশঙ্কা থেকে ভেজালকারীও মুক্ত নয়। এ জন্য ইসলাম তথা মানবতার বিধান হচ্ছে নিজের জন্য যা উপাদেয়, পছন্দনীয় ও ভালো মনে করা হবে, ঠিক আরেক ভাই-বন্ধুর জন্যও অনুরূপ ভালো কিছু প্রত্যাশা করা। তাই নিজে সর্বাবস্থায় সৎ, মহৎ দৃষ্টিভঙ্গি লালন করতে হবে এবং সতত চেষ্টার মাধ্যমে ভালো গুণ রপ্ত করেই অন্যের জন্যও অনুরূপ কল্যাণ কামনা করে যাওয়াই ইসলামের শাশ্বত নির্দেশনা সর্বস্তরের মানুষের প্রতি। এভাবে চললে নিজেও যেমন বাঁচবে, অন্যরাও বাঁচতে পারবে নিরাপদে-নির্বিঘ্নে।

নিজে যা চাইবে, অন্যের জন্যও তেমনই কামনা করা সবার উচিত এবং নৈতিক দায়িত্ব। সব ব্যবসায়ী, সব মানুষ যদি লোভ, অতি মুনাফাকে ঘৃণা করে, তবে দ্রব্যমূল্যের পাগলা ঘোড়া আর কেউ ছোটাতে পারবে না। কারো মনে কোনো অশান্তির হা-হুতাশে থাকবে না। আর তখন প্রতারণা আর ভেজালের দৌরাত্ম্য নিমিষেই কমে আসবে। আগে সৎ হতে হবে নিজেকে। তার দেখাদেখি অন্যরাও বদলে যাবে, বদলে যাবে ব্যবসার নামে দস্যুবৃত্তি। স্বস্তি খুঁজে পাবে সবাই। তাই আসুন, মাহে রমজানে আমরা আত্মসমীক্ষা ও আত্মজিজ্ঞাসার মাধ্যমে চিন্তায়-কর্মে ভেতর থেকে বদলে যাওয়ার অঙ্গীকার করি এবং সুসংকল্পবদ্ধ হই। মনে-প্রাণে মানবতা ও নৈতিকতা ধারণ করি।

আর সরকারের প্রতি বিশেষ আহ্বান, শুধু রমজান মাসে নয়, সর্বাবস্থায় যারা অযৌক্তিক ও অন্যায়ভাবে ভোগ্যপণ্য ও নিত্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে মানুষকে বিষিয়ে তোলে, তাদের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ করতে হবে। আর আইনি কোনো দুর্বলতা থাকলে যুগোপযোগী আইন প্রণয়ন করে অসাধু ব্যবসায়ীদের লাগাম টেনে ধরতে হবে। আর সেটা করতে হবে এখনই। তা না হলে অসততা আর ভেজালের বিষাক্ত কালো থাবা নিমিষেই জাতিতে গ্রাস করে ফেলবে। এই নিকৃষ্টতা প্রতিহত করা এখন সময়ের দাবি।
লেখক : কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

Leave A Reply

Your email address will not be published.