অনলাইন বাংলা সংবাদ পত্র

জটিল নির্বাচনী হিসেব ২০ দলীয় জোটে

সত্যের সৈনিক অনলাইনঃ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই হিসাব কষছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের শরিক দলগুলো। বিশেষ করে জোটের বাইরে থাকা আরও ৬/৭ টি দলের সঙ্গে আলোচনাধীন ‘জাতীয় ঐক্যের’ সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় এই হিসাব জটিল হয়ে উঠছে। জোটের বাইরের আগ্রহী দলগুলোর সঙ্গে নির্বাচনি আসনকেন্দ্রিক আলোচনা শুরু করেছে বিএনপি, এমন খবরও যাচ্ছে জোট-নেতাদের কাছে। তাই শরিক দলগুলোর নেতারা চাইছেন, দ্রুত নির্বাচনি ফায়সালা সেরে ফেলতে।

এদিকে, আসন বণ্টন ও নির্বাচনের প্রশ্নে বিএনপির নীতি-নির্ধারকরা প্রকাশ্যে মুখ খুলছেন না। তারা চাইছেন, শরিক ও আগ্রহী দলগুলোর প্রত্যাশা জেনে নিতে। একইসঙ্গে নির্বাচনের প্রশ্নে একটি যূথবদ্ধতা তৈরি করতেও। এক্ষেত্রে চাওয়া-পাওয়ার বিষয়টি টেবিলের নিচে রেখে আপাতত সরকারের বিরুদ্ধে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের আন্দোলন গড়ে তোলার পক্ষে মত দেন তারা।

গত ২৭ জুন বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে বৈঠকে আগামী নির্বাচন প্রসঙ্গে আলোচনা ওঠে। ওই বৈঠকে খেলাফত মজলিসের মহাসচিব আহমদ আবদুল কাদের, এলডিপি যুগ্ম মহাসচিব শাহাদাতে হোসেন সেলিম সরাসরি নির্বাচনের প্রসঙ্গে কথা বলেন। এছাড়া বাংলাদেশ ন্যাপ চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গাণিও নির্বাচনি আসন নিয়ে আলোচনার পক্ষে মত দেন।

এই প্রসঙ্গে এলডিপির যুগ্ম মহাসচিব শাহাদাৎ হোসেন সেলিম বলেন, ‘আকারে-ইঙ্গিতে আলোচনায় এসেছে, অনেকে বলেছেন, নির্বাচনের আগে তাড়াহুড়ো না করে কাজটি যেন গুছিয়ে করা যায়। এ বিষয়গুলো এখনই ফায়সালা করা দরকার। যখন ফায়সালা করতে চাইবেন, তখন ঝামেলা হতে পারে। ফলে আসনের ব্যাপারে আলোচনাগুলো হওয়া দরকার।’

খেলাফত মজলিসের মহাসচিব আহমদ আবদুল কাদের বলেন, ‘আমি জোটের মিটিংয়ে বলেছি, নির্বাচন নিয়ে আলোচনা শুরু করতে।’

জোটের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এলডিপির চেয়ারম্যান অলি আহমদ, কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহিম ও বিজেপি চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থকে সরাসরি খালেদা জিয়াই নিশ্চয়তা দিয়েছেন। তারা নিজ-নিজ এলাকা থেকে নির্বাচন করবেন। এছাড়া জোটের অন্যতম প্রধান শরিক জামায়াতের ৭০টি আসনে নির্বাচনের পরিকল্পনা থাকলেও চূড়ান্ত অর্থে কী হবে, এ নিয়ে এখনও দোটানায় রয়েছে দলটি। এছাড়া জোটের বাকি দলগুলোর মধ্যে কোন কোন নেতা আসন পাবেন, এ নিয়ে এখনও কোনও আলোচনা করেনি বিএনপি। আর এ বিষয়ে কোনও কথাও বলছেন না দলটির কোনও দায়িত্বশীল।

জোটের একটি দলের চেয়ারম্যান স্বীকার করেন, ‘নিজের জোটের সঙ্গে আলোচনা না করে আগ্রহীদের সঙ্গে আসন নিয়ে কথাবার্তা হয়। এটা তো জোটের ঐক্য ধরে রাখতে সমস্যার তৈরি করবে।’ শরিক একটি দলের চেয়ারম্যানের দাবি, ইতোমধ্যে সরকারের তরফ থেকে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকারের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা ও আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা ব্যক্তিগত পর্যায়ে যোগাযোগ করেছেন। বিশেষ করে দীর্ঘদিন সংসদীয় রাজনীতির বাইরে অবস্থান করে দল ও ব্যক্তিপর্যায়ে রাজনৈতিক সাফল্য নিয়ে চিন্তা করতেও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।’ এই নেতার ভাষ্য, ‘এখনও কোনও সংস্থাই চাপ দিচ্ছে না, প্রকৃত অর্থে চাপ দিলে বিএনপির সঙ্গে থাকা মুশকিল।’

এ প্রসঙ্গে জোটের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য বিজেপি চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘জাতীয় ঐক্যের ব্যাপারে তারেক রহমান তিনমাস আগেই প্রিসাইট করেছিলেন, তখন আমরা ছিলাম। আমরা সম্মতি দিয়েছিলাম যে, জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা হবে। সেখানে আমাদেরও সবাইকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, আমরা আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী অন্যান্য দলের সঙ্গে কথা বলবো। আমি মনে করি, এর ফলেই বিএনপি নিজেদের মতো করে অন্যান্য দলের সঙ্গে আলোচনা করছে।’

জোটের দলগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এলডিপির কর্নেল অলি (চট্টগ্রাম-১৩), ড. রেদোয়ান (কুমিল্লা-৭), শাহাদাৎ হোসেন সেলিম (লক্ষীপুর-১) এবং খেলাফত মজলিস আহমদ আবদুল কাদের (হবিগঞ্জ-৪), মুনতাসির আলী সিলেট-২ আসন চান। এর মধ্যে মুনতাসির আলীর আসনে বিএনপির প্রার্থী তাহমিনা রশীদ লুনা। মুনতাসির আলী জানান, জোটগত মনোনয়ন না পেলেও তিনি নির্বাচন করবেন। গত কয়েক বছর ধরে তার প্রস্তুতি চলছে।

বিভক্ত জমিয়তের এক অংশের চেয়ারম্যান মুফতি মুহম্মদ ওয়াক্কাস (যশোর-৫) আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। অন্য অংশে সুনামগঞ্জ থেকে শাহীনুর পাশা চৌধুরী নির্বাচন করবেন। এর বাইরে মাওলানা ইউসূফীও মনোনয়ন চান।

জাতীয় পার্টি (জাফর) থেকে শক্তিশালী প্রার্থী নেই। তবে দলটিতে প্রায় ১৭ জন সাবেক এমপি আছেন। এর মধ্যে প্রভাবশালী দুয়েকজনকে মনোনয়ন দেওয়া হতে পারে। বাংলাদেশ ন্যাপ থেকে জেবেল রহমান গাণি নীলফামারী-১ থেকে নির্বাচন করতে কাজ করছেন। তার ঘনিষ্ঠদের শঙ্কা, গাণিকে বিএনপি থেকে মনোনয়ন নাও দেওয়া হতে পারে। এক্ষেত্রে যুক্তি হিসেবে ঘনিষ্ঠ একজন নেতার ভাষ্য, সেখান থেকে খালেদা জিয়ার পরিবারের কেউ প্রার্থিতা করতে পারেন। এছাড়া জাগপা, এনপিপি, এনডিপি, লেবার পার্টি, পিপলস্ লীগ, ইসলামিক পার্টি, ন্যাপ ভাসানী, সাম্যবাদী দলগুলো মনোনয়ন বা চাওয়া-পাওয়ার বিষয়ে বিএনপির ওপর নির্ভর করছে।

বিএনপির দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানান, আগামী নির্বাচনে বিএনপি কাউকেই অবমূল্যায়ন করবে না। গত সাত-আট বছরে যারা একনিষ্ঠভাবে বিএনপির সঙ্গে কাজ করেছেন তাদেরকে নিশ্চিতভাবেই প্রতিদান দেবে বিএনপির হাইকমান্ড। মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে জেবেল রহমান গাণি, জয়া কাজীসহ আরও অনেকেই নিশ্চিত বলে দাবি করে ওই সূত্র।

জোটের শরিক, বিজেপি চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বিএনপির অবস্থান আমাদের সবার থেকে আলাদা। রাজনৈতিকভাবে, সাংগঠনিকভাবে সবার থেকে শক্ত। এটা দলীয় জোট হলেও এটা বিএনপিকেন্দ্রিক জোট। এক্ষেত্রে বিএনপির অনেক স্ট্র্যাটেজি থাকতেই পারে। জোটের ক্যারেক্টার বুঝতে হয়তো অনেকের সময় লাগছে। এখানে জোটের বার্গেডিং অবস্থা এক না।’

আন্দালিভ রহমান পার্থ আরও বলেন, ‘নির্বাচনি অবস্থান কী হবে, কে কী পাবেন, নেত্রীকে (খালেদা জিয়া) বাদ দিয়ে অন্যান্য অনেক ইস্যুকে বাইরে রেখে এই ব্যাপারগুলো নিয়ে আলোচনা করতে ফোরাম তৈরি না।’

জানতে চাইলে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আগামী নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক করতে সব দলকেও এগিয়ে আসতে হবে। সবাই মিলে গণতন্ত্রকে বিজয়ী করতে হবে। ছাড় দেওয়ার প্রয়োজন হলে, বিএনপি অবশ্যই ছাড় দেবে। তবে এখন দলের প্রধান জেলে আছে। এসব বিষয় নিয়ে কথা বলার উপযুক্ত সময় এখনও আসেনি।’ (সোনালী নিউজ)

০৮ জুলাই ২০১৮/সত্যের সৈনিক/সুলতান মাহমুদ

Leave A Reply

Your email address will not be published.