অনলাইন বাংলা সংবাদ পত্র

জড়ানো মায়ার সূতায় আমাদের বিদ্যালয়

ময়না মনিরা, ঢাকাঃ স্কুলের আঙিনায় পা দিতেই স্পন্দন বেড়ে গেলো । পায়ের গতি হল ধীর । চারদিক তাকিয়ে দেখছি । এই আমাদের স্কুল। কি মজার স্কুল!
‘’এইদিন দিন নয়, আরো দিন আছে
এইদিনেরে নিবে তোমরা সেইদিনের কাছে ।‘’
হায়রে কি মজার স্কুল!
বারবার গানটা মনের মাঝে বাজচ্ছিল । আসলেই কি মজার স্কুল । জীবনের একশত ভাগ মজার মাঝে পঞ্চাশ ভাগ মজাই থাকে এই ছাত্র জীবনে । খাবারের সময় মা চিন্তা করবেন। দুপুরের আগেই ফিরতে হবে ভেবেই তাড়াতাড়ি করছি । শিক্ষকদের সাথে দেখা করে চলে যাব । ও দাদুর সাথেও দেখা করতে হবে । মোড় নিচ্ছিলাম শিক্ষক রুমের দিকে। কে যেন ডাক দিল ময়না ? পিছনে তাকাতেই দেখি কেঊ নাই । আবার দুইপা বাড়াতেই ডাক -এদিক আয় । এবার বুঝলাম বিভূদী দাদু । কাছে গিয়ে প্রশ্ন করলাম দাদু তুমি কি চোখে ভাল দেখ ? এত দূর থেকে কিভাবে চিনলে ? রবীন্দ্রনাথের মত সাদা দাড়ি গোঁফওয়ালা দাদু মৃদু হেসে বলল ভালবাসা রে ময়না, ভালবাসা । কাছে গিয়ে বসলাম । দাদু সন্দেশ ধরিয়ে দিল। দাদুর দাড়িতে হাত দিতেই বলল তোর বোন তো শিক্ষক হইয়েছে, তাই না ? মাথা নাড়ালাম । সন্দেশের দিকে তাকিয়ে বললাম ‘’দাদু তোমার সন্দেশের মত এমন স্বাদ কোথাও পাই না কেন?” এ যে তোর দাদুর সন্দেশ! উত্তর দিলেন ঠিকই কিন্তু আগের কথা চালিয়ে যাচ্ছিলেন । মা বাবাসহ আমার প্রতিটা ভাইবোন সম্পর্কে সে খোঁজ রাখে । আশি উর্ধ্বে বয়সের দাদু কি স্বাবলিলভাবে সবকিছু বলছে । হ্যারে- তোর বড় ভাইয়ের মেয়ে ও তো এ স্কুলে পড়ে? হ্যাঁ । তুমিতো দেখি সবই জানো ! হাতটা ধরে স্নেহের সুরে বললেন, দাদুরে তোরা কি আমার পর ? অতি আপনজন । আর আপন জনের খোঁজ রাখবো না ?

সত্যি দাদুতো আমাদের অতি আপন জন । আপনজন শুধু রক্তে হয় ? না – রক্ত, বর্ণ, ধর্মের বাইরেও আপন সম্পর্ক হয় । দাদুর সাথে আমাদের সম্পর্কটা সে কথাই বলে । মিষ্টির দোকান বলতেই দাদুর দোকান । মিষ্টি যেমন হোক ভালবেসে দেওয়ার ভেতরে সীমাহীন মিষ্টি থাকে। প্রতিবছর অনেক শিক্ষার্থী স্কুল হতে বিদায় নেয় । আবার অনেকে ভর্তি হয় । হাজারো ছাত্রছাত্রী স্কুলে পড়তে আসে । পাঁচ থেকে ছয় বছর হাইস্কুলের জীবন পার করে । আমার মত অনেক ময়না দাদুর স্নেহের ছায়া পায় । দাদু হয়ত তাদের ভালবেসে সুখ পায় ।

মিষ্টির দোকানটা ভাল করে দেখলাম । দাদু দোকানটা বেশ বড় করেছো! ভেতরটা ও অনেক পরিপাটি করেছো যে ?

আমি না আমি না । ছেলে করেছে । তোর দাদু বুড়া হয়েছে না ? দোকানে বেশি সময় বসতে পারে না । ছেলের বসতে হয় । যেমন তেমন দোকানে বসলে ছেলের মান-সন্মান থাকবে ?

সে আগেও তো বসতো ?

তখন ছোট ছিল ।

বাস্তব সত্য ছোট থেকে বড় হওয়ার সাথে মানুষের মান-সন্মানেরও অনেক পার্থক্য থাকে । পার্থক্য থাকে না শুধু প্রকৃত ভালবাসার । কি ছোট কি বড় সববেলায় একই রকম । দাদু জঙ্গলবাঁধাল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অনেক ভালমন্দ এবং ভালবাসার স্বাক্ষী । একশত বছরের পুরাতন যশোরের স্বনামধন্য এই মাধ্যমিক বিদ্যালয় । প্রতি বছর ছাত্র-ছাত্রী বিদায় নেয় কিন্তু দাদু বছরের পর বছর একই জায়গায় বসে স্কুলের সব কিছু লক্ষ্য করে। বিন্দু হতে সিন্দু অর্থাৎ ক্ষুদ্র হতে স্বনামধন্য ও সম্পদশালী হয়ে উঠা সবই নিজ চোখে দেখেছেন । মিষ্টি বিক্রয় করে । শুধু বিক্রয় করে বললে ভুল হবে বিতরণও করে । নামকরা স্কুল হওয়ায় দূরদূরাত্ব হতে ছেলেমেয়ে পড়তে আসে । অনেকের কাছে টিফিনের টাকা থাকে না । দাদু তাদের বাকী দেয় । অনেক সময় মায়ার টানে টাকা ছাড়া দেয় ।

দুপুর একটা । নরেন্দ্র দাদা টিফিনের ঘণ্টা বাজালো । সাথে সাথে প্রতিটা ক্লাসরুম হতে দল বেধে বেরিয়ে আসল ছাত্রছাত্রী । সাদা আর নেভি ব্লু পোশাকে শৃঙ্খলবদ্ধ প্রত্যেককে মনে হচ্ছে ভবিষ্যতের সৈনিক । স্কুল পোশাক ছাড়া ক্লাসে প্রবেশ নিষেধ। নিয়মটা সুন্দর । পোশাক এক হওয়ার কারনে ছাত্র-ছাত্রীদের কোন ভেদাভেদ নাই । অনেকে দাদুর দোকানের দিকে আসছে টিফিন খেতে। দোকানটা এমন জায়গায় যেখান হতে স্কুলের সম্পূর্ণ অংশ ভালভাবে দেখা যায় । আমি এখান থেকে সবকিছু স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি । কি অপূর্ব এই স্কুল । চারদিক সবুজের সমারহ । সম্পদে ভরা কালের স্বাক্ষী এই স্কুল। এত মুগ্ধকর সম্পদে ভরপুর স্কুল বাংলাদেশে কম আছে । এ যেন প্রকৃতির লীলাভুমি । উত্তরদিকে দুইতলা বিশিষ্ট বিশাল ভবণ । এটা সকল শ্রেণির ক্লাসরুম ও কলা ভবন । এভবনের পাশেই আছে পোস্ট অফিস ও প্রাইমা্রি স্কুল । পিছনে সুপারি আর মেহেগনি বাগান। পূর্বদিকে বাণিজ্য ও বিজ্ঞান ভবণ । এভবনের পাশে শহীদ মিনার আর মডেল স্কুল। পিছনে আম, লিচু ও পেয়ারা বাগান । পশ্চিমদিকে চলাচলের পথ । পথের পাশে বিশাল মসজিদ আর দোকানপাট। তার পিছনে বিশাল বড় ফলের বাগান। আম, জাম, কাঁঠাল, অনারসসহ অসংখ্য ধরনের রসালো ফলে ভরা এ বাগান । মাঝে বিশাল মাঠ । মাঠের দক্ষিণদিকের প্রান্তে নারকেল বাগান । তার পরেই বুড়ি ভৈরব নদী ।

দেখতে দেখতে দাদুর দোকান ছাত্র-ছাত্রী দ্বারা কানায় কানায় ভরে গেছে । দাদু দাঁড়িয়ে বলল চল একপাশে বসি, ছেলে আসছে। ও-ই দোকান দেখবে । দাদুর সাথে একপাশে বসলাম । কথা বলছি আর লক্ষ্য করছি মাঠে খেলারত ছাত্র-ছাত্রীদের । লক্ষ্য করছি এখানে ওখানে দলেদলে বন্ধু-বান্ধবীদের আড্ডা আর গল্পের দৃশ্য । কানে আসছে দাদুর দোকানে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের কথোপকথন । টেবিলে টেবিলে কত গল্প, কত হাসি, কত গান কতইনা উত্তেজনা ! গল্পের বিষয় পরিবর্তন হয়েছে। বর্তমানে গল্পের বিষয় হয়েছে ইন্টারনেন্ট, ইউটিউব, ফেসবুক, হোয়াটসআপ । কিন্তু বন্ধুর স্কুলবেলা একই আছে । ওদের আচারণ আমাকে স্মৃতির অতলে তলিয়ে দিচ্ছে । মনে পড়ছে -মান্না দে-এর গান-‘
‘’কফি হাউজের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই’’ ।
কোথায় হারিয়ে গেল সোনালি বিকাল গুলো আজ আর নেই!‘’

কত স্মৃতি, কত আনন্দ এই স্কুল ঘিরে । কত ভালবাস্‌ কত বন্ধন এখানে । ভবনের ছাদ, বাগা,, নদী কোথায় নাই স্মৃতি? শীতের সকালে মাঠের রোদে বসে ক্লাস করছি । শিক্ষক বলেন যা কিছু কিনে আন । সেদিন আমি গেলাম দাদুর কাছ হতে মিষ্টি আনতে । অনেক মিষ্টি নিয়ে দাদুকে বললাম গার্হস্থ্য বিজ্ঞানের স্যারের নামে লিখে রাখ । আসার পথে দেখি বেশির ভাগ শিক্ষক এস্টেজে দাড়িয়ে আড্ডা দিচ্ছে । কাছে যেতেই বলল কিরে কি আনছিস আমাদের জন্য ? স্যার মিষ্টি । হাতেহাতে দিতেই বললো কারনটা কি ? সব খুলে বলতেই হাসির রোল ঊঠল । সাবাস তুই এই কাজটা করতে পারলি ! সেদিন শিক্ষকরাসহ ক্লাসের বন্ধুরা খুব আনন্দ করেছিলাম । আনন্দের কারন একটাই অন্য সময় খরচ হয় শিক্ষার্থীর আজ খরচ হয়েছে গার্হস্থ্য বিজ্ঞানের স্যারের । গার্হস্থ্য বিজ্ঞানের স্যারকে দেখে মনে হয়েছিল সেও খুব খুশি ।

প্রতিটা মুহূর্ত খুশিতে কাটতো । খুশিতে দিশেহারা আমরা প্র্যাকটিক্যালের জন্য যাচ্ছি । দশম শ্রেণির ছাত্রী তাতে কি ? আচারণ বাচ্চাদের মত । চুলের কোন গোঁজগাঁজ নাই, এলোমেলো । সাথে ছিলেন ইংরেজি শিক্ষক । কোথা থেকে একটা রাবার নিয়ে চুলগুলো আঁটস্যাট করে বেঁধে দিলেন । বাবা যেমন তার মেয়ের চুল বেঁধে দেয় এখানে তার কোন পার্থক্য ছিল না । শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক এখানে অত্যান্ত মধুর আর নিকটের । নিকটের না হলে শীতের রাতে শিক্ষার্থীর বাড়ি বাড়ি শিক্ষকরা যেতেন না । মাধ্যমিক সার্টিফিকেট পরীক্ষা মাঘ-ফাল্গুন মাসে হয় । প্রচণ্ড শীত থাকে তখন । ছাত্রছাত্রী্রা ঠিকভাবে পড়াশুনোর করছে কিনা লক্ষ্য করার জন্য প্রায়ই শিক্ষক শীতের রাতে বাড়ি বাড়ি ঘুরেন । শিক্ষার্থীরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে ভাল ফলাফলের জন্য । শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অক্লান্ত পরিশ্রমের দ্বারা ভাল ফলাফল আসে প্রতিবছর । আমার জানা নেই অন্য কোন বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এমনটা করেন কিনা ?

আজ এ স্কুল অত্র অঞ্চলের এক নাম্বার স্কুল । এক নাম্বার এ স্কুলের নিয়মনীতি । সকলের ক্ষেত্রে নিয়ম সমান । নিয়মনীতিতে শৃঙ্খলবদ্ধ শিক্ষক কমান্ডারের ভুমিকায় থাকে । শিক্ষার্থীরা কমান্ডারের সেই আদেশ নির্দিধায় পালণ করে । আদেশ থাকে স্কুল পোশাকে নির্দিষ্ট সময়ে অ্যাসেম্বলিতে আসতে হবে । সকালে অ্যাসেম্বলি প্রথমে কোরান তেলাওয়াত দিয়ে শুরু হয় । পর্যায়ক্রমে গীতা, শপথ বাক্য পাঠ, জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন করা হয় । শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রচুর হওয়ায় বিশাল মাঠের অনেকাংশ জুড়ে অ্যাসেম্বলি হয় । সব নিয়ম দেখলে বুঝা যায় অন্য স্কুল থেকে এই স্কুল কতটা পার্থক্য । সাদা আর নেভি ব্লু পোষাকে শিক্ষার্থীরা যখন অ্যাসেম্বলি করে মনে হয় বাতাসে সমুদ্রের ঢেঊ খেলে যাচ্ছে । কোন বাড়তি শব্দ নাই। এতটাই শৃঙ্খলাবদ্ধ যে সংখ্যায় অনেক হওয়ার পরও একটা কঠিন নীরবতা বিরাজ করে । সকলে সামনের দিকে তাকিয়ে । তারা শপথে বদ্ধপরিকর । তারা শপথ নিচ্ছে পরিবারের জন্য, সমাজের জন্য, দেশের জন্য । এ আর্দশময় বিদ্যালয় হতে শিক্ষা নিয়ে এগিয়ে যাবে সুশিক্ষার উচ্চতম স্থানে । যে শিক্ষার আলো তাকে সত্যের পথ দেখাবে ।

ইতিমধ্যে বহু শিক্ষার্থী সত্যের পথ খুজে পেয়েছে। আলোর রশ্নি ছড়িয়েছে শিক্ষা ক্ষেত্রে শিক্ষক হিসেবে । সেবা ক্ষেত্রে ডাক্তার হিসেবে । স্থাপনা ক্ষেত্রে ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে । ব্যবসা বাণিজ্য ক্ষেত্রে উদ্যাক্তা হিসেবে । দেশ-বিদেশে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে যুক্ত থেকে । হঠাৎ চীৎকারে গোল । ফিরলাম খেলার মাঠে । কি আনন্দ করছে প্রত্যেকে । মনে হয় এই জীবনটা আবার ফিরে পেতাম ! ফিরে পেতাম সেই বন্ধুদের! এভাবে গোল বলে আনন্দ করতাম । সহপাঠী বন্ধুদের জিতে নিজেরা জয়ী হতাম!

এস্কুলের বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস পালনের নিয়ম অনেক স্কুল হতে আলাদা । বছরের পর বছর এভাবে পালন করা হয় এই দিবস । ছেলে এবং মেয়েদের কয়েকটা হাঊজে ভাগ করা হয় । প্রত্যেক হাউজের নামকরন করা হয় একেকজন বিখ্যাত মানব বা মানবির নামে । নাম থাকে মাইকেল মধুসূদন হাউজ, কাজী নজরুল ইসলাম হাউজ, রাবেয়া হাউজ, বেগম রোকেয়া হাউজ প্রভৃতি । প্রতিটা হাউজে একজন করে ক্যাপ্টেন থাকে । স্বাধীনতা বা বিজয় দিবসে মাঠের মাঝে বিশাল একটা স্তম্ভ বসানো হয় । স্তম্ভের সাথে বিভিন্ন সাজ সজ্জা করা হয় । সামনের দিকে থাকে বিভিন্ন হাউজের ঘর । হাউজ ক্যাপ্টেনের দায়িত্ব থাকে পিটি-প্যারেট, খেলাধুলায়। হাউজ সাজানোর শ্রেষ্ঠত্ব দেখিয়ে তার হাউজকে প্রথম স্থানে নেওয়া । প্রতিটা হাউজ এতটাই প্রতিযোগিতা করে যে প্রধান অতিথি দ্বিধা দ্বন্দ্বে পরেন কোন হাউজকে প্রথম করবেন এই ভেবে । প্রধান অতিথি যখণ পিট-প্যারেটে সালাম গ্রহণ করেন, প্রত্যেকে এতটাই দক্ষতা দেখায় যে মনে হবে এরা সবাই ডিফেন্সে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত । আগামীর দেশ রক্ষক! দুই তিনদিন ব্যাপী চলে দিবস উদযাপন । দাওয়াত পত্র হতে শুরু করে সমাপনী সবই খুব নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করা হয় । বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতার সাথে থাকে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন বিভাগে বিভক্ত করে খেলাধুলার প্রতিযোগিতা । অতিথি, শিক্ষক ও অভিভাবকদের জন্য বিভিন্ন খেলার প্রতিযোগিতা । সর্বশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান । শিক্ষার্থীদের সাথে বিভিন্ন এলাকার মানুষ দ্বারা কানায় কানায় পূ্র্ণ থাকে চারধার । এভাবে মিলন মেলা বসে প্রতি বছর বিভিন্ন দিবসে ।

এস্কুলে ছেলেমেয়ে একসাথে শিক্ষা গ্রহণ করে । তাই ছেলেমেয়ে এক সাথে চলার নিয়ম এখান থেকে শিখে নেয় । ছেলেমেয়ের বন্ধুত্ব এখানে অত্যান্ত মধুর । সুখে আনন্দে দুঃখে বেদনায় সব ক্ষেত্রে বন্ধুর পাশে থাকে । মনে পড়ছে খুব বেশি বন্ধুদের কথা । মনে আছে স্বাধীণতা দিবস, বিজয় দিবস সব সময় ছেলেরা মেয়েদের সাহায্য করতো । পিকনিকের সময় ছেলেরা অনেক বেশি কাজ করতো । রাত জাগতো । অবশ্য তাদের কিছু দুষ্টূ চুরির স্বাক্ষী আমরা ছিলাম । বলা যায় পরোক্ষভাবে অংশ নিতাম । কখনো পাশের নদী বা পুকুর হতে মাছ চুরি । কখনো বাগানের ফল চুরি । কখনো কখনো প্রতিবাদের জন্য চুরি । খুব মনে পড়ছে তোদের । জীবনের কত গল্প ওদের নিয়ে । স্কুলের বন্ধুত্বের মত বিশুদ্ধ বন্ধুত্ব আর হয়না ।

জীবনে চলতে কত হতাশা, চাপা কান্ন, দুঃখে বারবার হোচট খাওয়া । জীবন যুদ্ধে হেরে যাওয়া । এত না পাওয়ার বেদনা, প্রতিযোগিতায় টিকতে না পারার কষ্ট সবকিছু থেকে নিজেকে শেষ করে মুক্ত হতে পারিনি । শুধু তোদের মত বন্ধুদের কারনে । একজন লেখকের উক্তিটি আজ খুব বলতে ইচ্ছে করেছে বন্ধুরা—-
‘’তোদের কাছে চাই জন্ম জন্মান্তরের বাঁধন ,
যে বাঁধনে আছে অমরান্তের স্বাদ ।
যেখানে এসে ছোট ছোট নদী মিলিত হয় ,
তৈরি হয় এক বিশাল সমুদ্র– বন্ধুত্ব’’।

টিফিন শেষ হল । ছাত্রছাত্রীরা ক্লাসে ফিরছে ।আবার স্কুল মাঠ আর মাঠের চারদিক নিস্তব্ধ । পাখিরা যেমন কিচিরমিচির শব্দ করে নিজেদের আনন্দ প্রকাশ করে এতক্ষণ তেমনি শব্দ ছিল ।

বিদায় নিলাম দাদুর কাছ থেকে । শিক্ষক রুমের দিকে যাচ্ছি। ক্লাস রুমের কাছে কেমন যেন একটা শিহরন জাগচ্ছে মনের ভিতর ! মনে পড়ছে প্রধান শিক্ষকের কথা । খুব রেগে আছেন! বেয়াদবী সবগুলোর চামড়া তুলে ফেলবো বলছেন আর ক্লাসে ঢুকছেন । তাড়াহুড়োর ভিতর ঢুকতে গিয়ে ড্যাস্টার ছুটে আমার গায়ে লাগল । প্রধান শিক্ষকের সেকি উত্তেজনা তোর কোথায় লাগছে? অনেক ব্যথা পেয়েছিস ? আহারে ! দেখি দেখি । আমার ব্যথা তখন আমার কাছে তুচ্ছ, আমি তার মমতায় বেশি আনন্দ পাচ্ছিলাম । এই ঘটনার জন্য সেদিন সবাই ক্ষমা পেয়েছিলাম । আসলে আদরের সাথে শাসন না থাকলে সঠিক পথটা চেনা যায় না । শাসনের সাথে আদরের সংমিশ্রনটা এ বিদ্যালয়ে খুব বেশি বিদ্যমান ।

শিক্ষক রুমের কাছে আসছি । কানে বাজচ্ছে সেই কথা কিরে না’ র দল কোন মতলবে একসাথে এখানে ? আমাদের বাণিজ্য বিভাগের সবগুলো মেয়ের নামের শেষ ‘না’ ছিল- ময়না, রোকসানা, মেরিনা, পারভিনা। বাণিজ্য বিভাগের শিক্ষক নাম দিয়েছিল ‘না’-এর দল । তার কাছে আমাদের আবদারের শেষ ছিল না । তাইতো শিক্ষক রুমের কাছে গেলেই বলতো মতলব কি ?

রুমে ঢুকার অনুমতি নিতেই শিক্ষক বলল আরে আমাদের পাখি যে? আয় আয় ভিতরে আয় । ভিতরে বসলাম । অনেক শিক্ষক বিদায় নিয়েছে তাদের স্থানে নতুন শিক্ষক আসছে । আমার শিক্ষক তাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল ব্যাচ নাম্বার আরও দুষ্টু কিছু বিশ্লেষণসহ । পিয়নটা প্লেটে করে কাঁঠাল দিয়ে গেল । আমার শিক্ষক হাতে নিয়ে বললো নে নে খা । কি মমতা জড়ানো খাবার !

হাতে নিয়ে ভাবছি ২০১৩ সালে শেষ একবার আসছিলাম দুইদিন ব্যাপী পুণর্মিলনী অনুষ্ঠানে । সেখানে প্রাক্তন শিক্ষকরা এসেছিলেন । তাদের আপ্যায়ণ সঠিকভাবে হচ্ছে কিনা দেখতে গেলাম । প্রত্যেক শিক্ষকের কাছে যাচ্ছি আর প্রত্যেকেই আদর করে আমাকে খাবার তুলে দিচ্ছে । কত খাবার আমার হাতে । প্রতিটি খাবারে স্নেহ জড়ানো । আমার ভিতরটা ভরে গেছে সুখ আর ভালবাসায় । এরমধ্যে নতুন একজন শিক্ষক প্রশ্ন কোথায় আছেন আপনি ? কি করছেন ? ভাবনা থেকে ফিরলাম তার দিকে । কথা হলো তার সাথে । কথায় কথায় বললেন স্যারেরা কিছুকিছু ছাত্রছাত্রীদের কথা অনেক বেশি বলে । যাদের কথা আমাদের মুখস্থ হয়ে গেছে । আমি হাসলাম । নতুন শিক্ষক অনেক বিনয় আর ভদ্রভাবে কথা বলছে । আসলে এটা এই বিদ্যালয়ের অবদান । প্রাক্তন শিক্ষকদের কাছ থেকে তারা এটা রপ্ত করেছে । যেখানে যে জিনিসের সংখ্যা বেশি থাকে সেখানে সেই জিনিসের প্রতিযোগিতা হয় । এ বিদ্যালয়ে ভাল বিষয়ের সংখ্যা বেশি । কে আরো ভাল হতে পারে এখানে তার প্রতিযোগিতা হয় । আমি আমার শিক্ষক বারান্দাতে দাঁড়িয়ে । বিদায় নিলাম । এভাবে মাধ্যমিক পরীক্ষার সময় বিদায় নিয়েছিলাম । যে বিদায়টা ছিল কঠিন বিদায় । সেদিনের সেই বিদায়ের কান্না আজও মনে আছে । এই বিদ্যালয় থেকে বিদায় নিয়া চলে যাচ্ছি তা যেন কোন ভাবে সহ্য করতে পারছিলাম না । তারপর অনেক বছর কেটেছে । কিন্তু মনে হয় এইতো সেদিন । পিছন ফিরে তাকালাম স্যার এখনো দাঁড়িয়ে আছে । সামনে দিকে পা বাড়ালাম মায়ের কাছে যাব । এক মমতা হতে আরেক মমতার কাছে যাওয়া! মায়ের কাছে অনেক শিক্ষা নিয়েছি । যে শিক্ষা প্রকৃতির মত । আর এই বিদ্যালয় থেকে শিক্ষা নিয়েছি বিদ্যা আলোর । তাই বলি, বারবার বলি-
বিদ্যালয় মোদের বিদ্যালয়, এখানে সভ্যতারই ফুল ফুটানো হয়,
এখানে জ্ঞানের আলোর মশাল জ্বেলে হয়রে সূর্যোদয় ।

২৪ মার্চ ২০১৮/সত্যের সৈনিক/সুলতান মাহমুদ

Leave A Reply

Your email address will not be published.