অনলাইন বাংলা সংবাদ পত্র

এ যেন নীরব গণহত্যা -মোশাররফ হোসেন

মেডিসিনের জনক ‘হিপোক্রেটিস’ বলেন, সুষম খাবারই সব রোগের নিরাময়। অথচ সেই সুষম খাবারই এখন অপমৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকার নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে না পারলে জনগণের খাদ্য অধিকার লঙ্ঘিত হয়। নিরাপদ খাদ্য আবার খাদ্য নিরাপত্তার অপরিহার্য অংশও বটে। তাই এটি নিশ্চিত করতে না পারলে সার্বিকভাবে খাদ্য নিরাপত্তা বিঘিœত হয়। বর্তমানে শাক-সবজি, মাছ-মাংস, ফলমূল এমনকি শিশুখাদ্য এবং ওষুধে পর্যন্ত ভেজাল ও রাসায়নিক পদার্থের ব্যবহার বৃদ্ধি জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিতে পরিণত হয়েছে। ভেজাল খাদ্য গ্রহণের ফলে নানাবিধ দুরারোগ্য ব্যাধি ও জীবনহানির ঘটনাও ঘটছে প্রতিনিয়ত। বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৪৫ লাখ লোক খাদ্যে বিষ্ক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে এবং ধীরে ধীরে তারা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। এতে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, ভেজাল খাদ্য খেয়ে অসুস্থ হওয়া, জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে গিয়ে প্রচুর অর্থের জোগান সংশ্লিষ্ট পরিবারকে হুমকির মধ্যেও ফেলে দিচ্ছে।
সম্প্রতি ভেজাল প্রতিরোধে সরকারি ও বেসরকারিভাবে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যেমন : নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩ প্রণয়ন, ফরমালিনের অপব্যবহার রোধে ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৩-এর খসড়া প্রণয়ন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক খাদ্যে ভেজাল নিয়ন্ত্রণে বাজার পরিদর্শন কার্যক্রম জোরদারকরণ, এফবিসিসিআইয়ের ব্যবস্থাপনায় ঢাকা মহানগরসহ বিভিন্ন জেলার মোট ১৮টি কাঁচাবাজারকে ফরমালিনমুক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ, জাতিসংঘ খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং বাংলাদেশ সরকারের যৌথ সহযোগিতায় নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণে প্রকল্প গ্রহণ ও জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে একটি স্বতন্ত্র খাদ্য পরীক্ষাগার স্থাপনসহ মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে বিভিন্ন সময় খাদ্যে ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালনা উল্লেখযোগ্য। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণ তথা খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধে এসব উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার; কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই সন্তোষজনক নয়। কারণ খাদ্যে ভেজালের বিষয়টি প্রতিবছরই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সাময়িক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। এসব উদ্যোগ সত্ত্বেও ভেজাল খাদ্যের ব্যাপকতা অব্যাহত থাকে। ভেজালকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয় না। অপরদিকে তদারক-সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধেও অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ অহরহ দেখা যায়।
বাংলাদেশে ভেজাল খাদ্যের ব্যাপকতা, খাদ্যে ক্ষতিকারক রাসায়নিকের ব্যবহার ও স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে গবেষণা হলেও এর বাস্তব প্রতিফলন খুব একটা দেখা যায় না। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণে তদারকি-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সুশাসনের সমস্যা সম্পর্কে এক গবেষণায় বলা হয়েছে, নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩ সালের ১০ অক্টোবর প্রণীত হলেও গেজেট আকারে প্রকাশ করে কার্যকর করা হয়নি। ফলে খাদ্য তদারকি ও পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে জনবলের স্বল্পতা, প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের ঘাটতি, ক্ষতিগ্রস্ত ভোক্তার সরাসরি মামলা করার বিধান না থাকা, ভোক্তার অভিযোগ নিরসনে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং ভোক্তা বা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি কর্তৃক নমুনা পরীক্ষার ব্যয়ভার বহনের বাধ্যবাধকতা থাকা, ভেজাল খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, নমুনা পরীক্ষায় দীর্ঘসূত্রতা, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়ের অভাব সর্বোপরি ভেজাল খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থ হওয়ায় দেশে ভেজাল খাদ্য উৎপাদন বন্ধ না হয়ে বরং দিন দিন তা বেড়েই চলেছে। এ ছাড়া ভেজালবিরোধী অভিযানের সময় ম্যাজিস্ট্রেটের ওপর সংঘবদ্ধ হামলা বা সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেটকে কর্মক্ষেত্রে নাজেহালের চিত্রও আমরা অতীতে দেখেছি। দেশের বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির বিরুদ্ধে ভেজাল খাদ্য তৈরির অভিযোগ থাকার পরও কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে বরং আরো বেশি প্রচারের মাধ্যমে ঘাটতি বাড়ানোর প্রচেষ্টা দেশবাসীকে অবাক করেছে।
নিরাপদ খাদ্যের তদারকি কার্যক্রমে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও বিএসটিআই কাজের পরিধি ও ভৌগোলিক আওতা বিবেচনায় মাঠপর্যায়ে প্রয়োজনীয়সংখ্যক জনবলের অভাব রয়েছে। বর্তমানে দেশের ৩১৯টি পৌরসভা ও ১১টি সিটি করপোরেশনে প্রয়োজন অনুযায়ী জনবলস্বল্পতার কারণে নিরাপদ খাদ্যের নজরদারি কার্যক্রম চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে।
এ ছাড়া প্রতিবেদনে স্যানিটারি ইন্সপেক্টর এবং বিএসটিআইয়ের ফিল্ড অফিসার কর্তৃক রেস্তোরাঁ, বেকারি ও খুচরা বিক্রেতা পরিদর্শনে অনৈতিক লেনদেনের বিনিময়ে শৈথিল্য প্রদর্শন; মাসিক ভিত্তিতে স্যানিটারি ইন্সপেক্টর কর্তৃক বড় দোকানদার, রেস্তোরাঁ ও বেকারির মালিকের সঙ্গে সমঝোতামূলক দুর্নীতি, নমুনা পণ্যের নামে ব্যক্তিগত ভোগে ব্যবহার, ঢাকা সিটি করপোরেশনের কিছুসংখ্যক ইন্সপেক্টর কর্তৃক পরিদর্শন কার্যক্রমে নিজ উদ্যোগে সোর্স নিয়োগ এবং বেতন ও সুবিধাদি নিয়মবহিভর্‚তভাবে আদায়, জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও পরীক্ষাগারে পণ্যের নমুনা পরীক্ষা না করে অনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে সনদ প্রদানের চিত্র বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে এসেছে।
বিশুদ্ধ খাদ্য অধ্যাদেশ, ১৯৫৯-এ প্রতিটি জেলা ও মহানগরে খাদ্য আদালত স্থাপনের বিধান থাকলেও আজ পর্যন্ত তা করা হয়নি। এ ছাড়া দেশের প্রতিটি জেলা ও মহানগরে বিশুদ্ধ খাদ্য আদালত গঠনের বিষয়ে ২০০৯ সালের হাইকোর্টের আদেশও বাস্তবায়িত হয়নি। উল্লেখ্য, এখন পর্যন্ত সারা দেশের মধ্যে একমাত্র ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় একটিমাত্র খাদ্য আদালত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
আমাদের দেশে ভেজাল পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে কঠোর আইনেরও যথেষ্ট অভাব রয়েছে। বিশুদ্ধ খাদ্য অধ্যাদেশ, ১৯৫৯ (সংশোধিত ২০০৫)-এ সর্বোচ্চ এক বছর সশ্রম কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। অপরদিকে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এ সর্বোচ্চ তিন বছর কারাদণ্ড বা অনধিক দুই লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। নতুন প্রণীত নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩-তে জরিমানা ও শাস্তির পরিমাণ বৃদ্ধি করে অনূর্ধ্ব পাঁচ বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ১০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান করা হলেও এখানে সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়নি। কিন্তু বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে খাদ্যে ভেজাল মেশানোর অপরাধে যথোপযুক্ত শাস্তি দেওয়া হয়। খাদ্যে ভেজাল মেশানোর অপরাধে ভারতে যাবজ্জীবন, পাকিস্তানে ২৫ বছর কারাদণ্ড, যুক্তরাষ্ট্রে সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। অর্থাৎ কঠোর আইনের অভাবের পাশাপাশি বিদ্যমান আইনের সঠিক বাস্তবায়ন ভেজাল প্রতিরোধে প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করছে বলেই প্রতীয়মান হয়।
এখানেই শেষ নয়, খাদ্য তদারকি ও পরিদর্শনে প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবের পাশাপাশি পর্যাপ্ত বরাদ্দের অভাব, লজিস্টিকস ও যানবাহনের অভাব, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব, পর্যাপ্ত প্রণোদনার অভাব, খাদ্যের নমুনা সংগ্রহ-রক্ষণাবেক্ষণের সমস্যার কারণে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে কর্মরতরা ইচ্ছা সত্তে¡ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করতে পারেন না। এ ছাড়া নজরদারির কার্যক্রম শুধু মহানগরগুলোতে দৃশ্যমান হলেও উপজেলা বা গ্রামপর্যায়ে তা মোটেই লক্ষণীয় নয়। অথচ খাদ্যে সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রাষ্ট্রপ্রধান থেকে শুরু করে দেশের সব নাগরিকের সমানভাবে রয়েছে। খাদ্যে ভেজাল ও জনস্বাস্থ্যের হুমকি : নৈতিকতা, আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং সচেতনতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই।
দেশের প্রতিটি মানুষের নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি সুস্থ-সবল উন্নত জাতি ও উন্নয়নশীল দেশ গঠনের মাধ্যমে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নে সরকারকে ওপরে উল্লিখিত কারণগুলো পর্যবেক্ষণ করে প্রতিকারের ব্যবস্থা নিতে হবে। নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩-এর বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জগুলো সংশোধন করে দ্রুত কার্যকরের ব্যবস্থা গ্রহণ, ভোক্তাপর্যায়ে সরাসরি আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার বিধান চালু, মোবাইল কোর্ট পরিচালনায় আইনি সহায়তা বাধ্যতামূলক করে ভোক্তা অধিকার আইন সংরক্ষণ, আইন-২০০৯-এর প্রয়োজনীয় সংস্কার, প্রতিটি জেলা ও মহানগরে খাদ্য আদালত গঠন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বিএসটিআই ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বহু বছর ধরে চলা সমন্বয়হীনতা স্থায়ী নিরসনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের নৈতিকতা বজায় রেখে ব্যবসা ও গণমাধ্যমের সরব নজরদারির মাধ্যমে জনসচেতনতা বৃদ্ধিরও কোনো বিকল্প নেই।

লেখক : সমাজবিশ্লেষক ও সাংবাদিক

Leave A Reply

Your email address will not be published.