অনলাইন বাংলা সংবাদ পত্র

চিকিৎসা পেশা মহান, এর মান ক্ষুণ্ণ করবেন না -এম এ মোতালিব

চিকিৎসা পেশাকে মহৎ পেশা বলা হয়। পৃথিবীতে এর চেয়ে মহৎ পেশা দ্বিতীয়টি নেই। এই পেশায় যারা আত্মনিয়োগ করেন, তাদের সর্বস্তরের মানুষ শ্রদ্ধার চোখে দেখে। এই শ্রদ্ধায় জায়গাটুকু অক্ষুণ্ণ রাখতে সর্বদা সচেষ্ট থাকতে হবে তাদের। কোনো প্রকার লোভ-লালসার বশবর্তী হয়ে এই পেশায় আত্মনিয়োগ করলে তার দ্বারা এ পেশা কলঙ্কিত ছাড়া কোনো সুনাম বয়ে আনবে না। এ পেশার প্রতিটি ব্যক্তিকে হতে হবে অত্যন্ত সচেতন, দায়িত্ববান এবং মানবিক গুণসম্পন্ন। যাদের একমাত্র উদ্দেশ্য থাকে মুনাফা অর্জন, তাদের এ পেশায় না আসাই উত্তম। এ পেশার বাইরে মুনাফা অর্জনের জন্য অন্য হাজারো পেশা আছে, যা মানুষকে ততটা ক্ষতি করবে না, যতটা চিকিৎসার বেলায় করবে। স্বাস্থ্য নিয়ে, চিকিৎসা নিয়ে মুনাফার চিন্তা করলে এ পেশার মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হবে। তবে সেবার মনোভাব নিয়ে যারা এ পেশায় আত্মনিয়োগ করে, তাদের অর্থ, প্রতিপত্তি ও মর্যাদার কোনো কমতি হয় না। আর স্বচ্ছ মানসিকতা নিয়ে যারা যে পেশায়ই আত্মনিয়োগ করুক না কেন, তাদের প্রতি সৃষ্টিকর্তার অশেষ রহমত থাকে, মানুষের নেক নজর থাকে। এ বিষয়গুলোর প্রতি খেয়াল করে যারা পেশাদারিত্বের মনোভাব নিয়ে কর্মদক্ষতা দেখিয়ে যান, তাদের সফলতা কেউ কখনো রোধ করতে পারে না। অন্য প্রসঙ্গ না টেনে আজও চিকিৎসার বিষয় নিয়ে কিছু বলতে চাই।
চিকিৎসা পেশায় আত্মনিয়োগকারীদের সর্বদা মানবিক গুণসম্পন্ন হতে হয়। তাদের বিভিন্ন দিক বিবেচনা করে রোগীকে সঠিক চিকিৎসা দিতে হয়। একজন রোগীকে আন্তরিকতার সঙ্গে চিকিৎসা দিয়ে তাকে সুস্থ করে তোলাই হলো একজন চিকিৎসকের দায়িত্ব, কর্তব্য এবং সফলতা। অঙ্গীকারবদ্ধও বলা চলে। রোগের প্রতি, রোগীর প্রতি, রোগীর সামর্থ্যরে প্রতি, সামাজিকতার প্রতি, দায়বদ্ধতার প্রতি খেয়াল রেখে চিকিৎসা দিতে হয় একজন চিকিৎসককে। কোনো রোগী যখন একজন চিকিৎসকের কাছে আসে, ওই চিকিৎসকের উচিত সাধ্যানুযায়ী সঙ্গে সঙ্গে সঠিক চিকিৎসা দেওয়া। কিন্তু কোনো রোগীকে জিম্মি করে কিংবা মুনাফা অর্জনের ধান্ধায় অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসায় প্রলুব্ধ করে কিংবা ভয়-ভীতি দেখিয়ে, আতঙ্কিত করে চিকিৎসায় বাধ্য করানোর মতো গর্হিত কাজ কোনো চিকিৎসক করতে পারেন না। যারা করেন, তারা চিকিৎসক নন, চিকিৎসক নামের কলঙ্ক। তারা সর্বত্রই ঘৃণার পাত্র। এ ধরনের মানসিকতা পোষণকারীদের চিকিৎসা জগৎ থেকে বিতারণ করা অধিক মঙ্গলজনক।
মনে রাখতে হবে, একজন চিকিৎসক মূলত চারটি প্রধান কারণে এ পেশায় অংশগ্রহণ করেন। যেমন-
১) ব্যক্তিগত পর্যায় : ব্যক্তিগত এমন কিছু বিষয় আছে, যেগুলো মনে ধারণ করে একজন চিকিৎসক চিকিৎসা পেশায় আত্মনিয়োগ করে থাকেন। যেমন;
* পেশার প্রতি সামাজিক আকর্ষণ ও পদমর্যাদা : সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে অনেকে এ পেশায় আত্মনিয়োগ করে। এ পেশায় আকর্ষণ করার কারণ, এ পেশায় থেকে মানুষের হৃদয় যতটা স্পর্শ করা যায়, অন্য পেশায় ততটা সম্ভব নয়। একজন মুমূর্ষু রোগী যখন আল্লাহর অশেষ রহমতে এবং চিকিৎসকের সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ জীবন ফিরে পায়, সেই ব্যক্তিটি অন্তর থেকে ওই চিকিৎসককে দোয়া করে এবং ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ করে। এতে চিকিৎসক সামাজিকভাবে সম্মানিত হন এবং তার পদমার্যাদা বৃদ্ধি পায়, গর্বিতবোধ করেন। এর চেয়ে বড় পাওয়া বা তৃপ্তি আর কী হতে পারে।
* অর্থনৈতিক অবস্থানকে আরো বেশি শক্তিশালীকরণ কিংবা বাস্তব জীবনে টিকে থাকা : একজন চিকিৎসক রোগীকে সঠিক চিকিৎসা দিয়ে আত্মতৃপ্তিই লাভ করেন না, আর্থিকভাবেও লাভবান হন। সুচিকিৎসা পেয়ে মানুষ তাকে আর্থিভাবে মূল্যায়িত করে এবং সামাজিকভাবে তিনি উচ্চ মর্যাদার আসনে আসীন হন। আর তার এ আসন অনন্তকাল টিকে থাকে।
* পরিবার, বন্ধু-বান্ধব বা প্রচারমাধ্যমে প্রভাব বিস্তার : একজন চিকিৎসক যখন আন্তরিকতা দিয়ে মানুষের সেবায় নিয়োজিত হন, পরিবার ও বন্ধু-বান্ধবের কাছেও তার মর্যাদা বেড়ে যায়, তাকে নিয়ে সবাই গর্ববোধ করে, বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমে তার নাম-ডাক, জোশ-খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। এটাই তার কাক্সিক্ষত ফলাফল।
* ব্যক্তিগতভাবে রোগী এবং ব্যক্তির দুর্দশা লাঘবে অঙ্গীকার করা : একজন চিকিৎসক ব্যক্তিগতভাবে রোগী ও ব্যক্তির বিভিন্ন উপসর্গ এবং দুর্দশা লাঘবে অঙ্গীকার করেই এ পেশায় নিয়োজিত হন। তার উদ্দেশ্যই থাকে মানুষের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করা। এটাই তার তৃপ্তি, এটাই তার অহংকার।
* ধর্মীয়, দার্শনিক বা জীবনে ওষুধের প্রভাব ও বিশ্বাসবোধ : মানুষের সেবা করার মতো মহৎ কাজ আর নেই, সেটা যদি হয় মৃত্যুর দুয়ার থেকে চিকিৎসার মাধ্যমে কাউকে ফিরিয়ে আনা, তাহলে তো আর কথাই নেই। অনেক চিকিৎসক আবার গবেষণার মাধ্যমে বিভিন্ন রোগের দাওয়াই আবিষ্কার করেন। এবং বিশ্বাস করেন, এটা সেবন বা গ্রহণ করলে মানুষ উপকৃত হবে। তার এ আবিষ্কারে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ উপকৃত হবে। এটাই তার গর্ব, এটাই তার অহংকার। আর এ কাজটা করতে পারলে তিনি আনন্দবোধ করেন এবং মানসিকভাবে তিনি তৃপ্তি লাভ করেন।
* অন্য জীবনের সুযোগ-সুবিধা প্রত্যাখ্যান করা : যারা এ পেশায় আত্মনিয়োগ করেন, তারা অন্য পেশার বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা প্রত্যাখ্যান করেন। তারা ভাবেন চিকিৎসা সেবার মাধ্যমে নিজেকে মর্যাদার সুউচ্চ আসনে আসীন করা যায়। পাশাপাশি অন্য পেশার চেয়ে এ পেশার সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে মানুষে হৃদয় জয় করা অত্যন্ত সহজ। তাই তো অন্য পেশার যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা পরিত্যাগ করে অনেকেই এ পেশায় নিজেকে সঁপে দেন।
২) বৈজ্ঞানিক গবেষণায় : এ পেশায় অংশগ্রহণকারীদের অন্যতম বাসনা হলো;
* এই চিকিৎসা পেশায় আত্মনিয়োগ করে নিত্য-নতুন বৈজ্ঞানিক জ্ঞান উপযোগী দ্রব্য আবিষ্কারের মাধ্যমে মানুষের দুর্দশা দূরীকরণে সহায়তা করা।
* বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির শক্তিশালী অংশ হিসেবে নিজেকে রোগীর স্বাস্থ্যে প্রভাব বিস্তার করা।
* এ পেশায় থেকে রোগীর মনোযোগ আকর্ষণপূর্বক নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও পর্যবেক্ষণকেন্দ্রিক পড়াশোনার লক্ষ্যে সেবামূলক প্রতিষ্ঠান ও ব্যবহারিক গবেষণার মাধ্যমে উন্নততর উদ্ভাবনী প্রচেষ্টায় অংশগ্রহণ করা যায়।
* চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নয়ন ও উত্তরণে চাহিদা ব্যাপক। এ পেশায় থেকে ক্রমাগত চাহিদা নিবারণের লক্ষ্যে পড়াশোনায় ধারাবাহিকতা রক্ষা করাও চিকিৎসকের অন্যতম নীতি হওয়া উচিত। আর এটাই একজন চিকিৎসকের অন্যতম কাজ।
৩) সামাজিক দায়বদ্ধতা : সামাজিক দায়বদ্ধতা অনেক বড় জিনিস। সবাই এটাকে মেনে নিতে পারে না। এ পেশায় আত্মনিয়োগ করার উদ্দেশ্যই থাকে;
* সমাজের উচ্চপর্যায়ে নিজস্ব ভাবমূর্তি রক্ষার্থে উচ্চ শ্রেণিতে অবস্থান করা।
* সামাজিক দায়বদ্ধতা হিসেবে রোগ নির্মূলে ভূমিকা রাখা। আর সমাজে অবস্থানকারী ব্যক্তিদের স্বাস্থ্য ও স্বাধীনতা রক্ষায় ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানো।
* সামাজিক অবক্ষয়, ভারসাম্যহীনতা রক্ষার্থে ও সমতাবিধানে পথিকৃতের ভূমিকা পালন করা।
৪) অভ্যাসগত : অভ্যাসগতভাবেই একজন সুচিকিৎসক মানবিক গুণসম্পন্ন হয়ে থাকে। তারা ভাবেন;
* চিকিৎসকের পারিশ্রমিক সম্মানজনক। সাধারণ অর্থে একজন চিকিৎসকের অর্থ উপার্জন কিংবা গড়পড়তা আয় অন্য যেকোনো পেশার তুলনায় অনেক বেশি, যা তাকে উন্নত জীবনধারণে সর্বাত্মক সহায়তা করে। এরফলে তিনি সৎ ও স্বচ্ছলভাবে সুন্দর পারিবারিক পরিবেশে জীবনযাপন করতে পারেন।
* বহুমুখী, বিচিত্র ও জীবনমুখী পেশা হিসেবে একজন চিকিৎসক বিশেষজ্ঞ হিসেবে বিভিন্ন স্থানে গমন করেন এবং সময়কে যথেষ্ট মূল্যায়নে তিনি হন নিবেদিতপ্রাণ।
এ সব কিছু মনে ধারণ করে একজন চিকিৎসক এ পেশায় মনোনিবেশ করেন। এই মহৎ উদ্দেশ্যকে যারা মনে-প্রাণে লালন করে সামাজিক ও মানবিক সেবায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন, তারা হন মহান, প্রতিটি মানুষে হৃদয়ে তাদের মর্যাদা ও ভালোবাসা অনন্তকাল জাকরুখ থাকে। যারা এ মহান পেশার অমর্যাদা করেন, বিভিন্ন লোভ-লালসার কাছে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন, স্বার্থপরতা যাদের আবিষ্ট করে রাখে, তারা হয় সমাজে ঘৃণীত ব্যক্তি। তারা রোগটাকে প্রাধান্য না দিয়ে, সেটাকে পুঁজি করে অর্থ হাতিয়ে নেন। আমার গত লেখার এদের লোমহর্ষক কিছু বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। সব চিকিৎসকই যে এমন তা নয়। চিকিৎসা জগতে গুটিকয়েক ভাইরাস ঢুকে এ জগৎটাকে কলঙ্কিত করছে। এরা যেমন সমাজে ঘৃণার পাত্র, তেমনি প্রতিটি ক্ষেত্রে তারা প্রত্যাখ্যাত। প্রশ্রয় পেয়ে তারা মহামারির আকার ধারণ করেছে। একযোগে এদের প্রতিহত করতে না পারলে দুর্ভোগের কবল থেকে জাতি কখনো নিস্তার পাবে না।

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক
ই-মেইল : [email protected]

Leave A Reply

Your email address will not be published.