অনলাইন বাংলা সংবাদ পত্র

তরুণদের কর্মক্ষম করতে চাই সঠিক পরিকল্পনা -এম এ মোতালিব

আমাদের দেশে মোট জনসংখ্যার ৬৬ শতাংশ মানুষ কর্মক্ষম ‘শেপিং দ্যা ফিউচার : হার্ড চেঞ্জিং ডেমোগ্রাফিক্যাল পাওয়ার হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এই পরিসংখ্যান দেওয়া হয়েছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেশে কর্মক্ষম জনসংখ্যা সাড়ে ১০ কোটিরও বেশি। আগামী ১৫ বছরে কর্মক্ষম জনসংখ্যা হবে প্রায় ১৩ কোটি। বর্তমানে দেশে মোট জনসংখ্যার ৪৯ শতাংশের বয়সই ২৪ বছর বা তার নিচে। এ প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে ইউএনডিপির নিউ ইয়র্ক কার্যালয়ের বিশেষজ্ঞরা। এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মানব-উন্নয়নবিষয়ক প্রতিবেদনে ৪৫টি দেশের জনসংখ্যাভিত্তিক তথ্য পরিবর্তনের ধরন এবং করণীয় সম্পর্কে বিশদ বিবরণ প্রকাশ করা হয়েছে এতে।
বাংলাদেশে যে পরিমাণ কর্মক্ষম মানুষ আছে অনেক উন্নত দেশে সে পরিমাণ লোকই নেই। আবার কোনো কোনো উন্নত দেশে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমতে শুরু করেছে। তার বিপরীতে বাংলাদেশে আরো ১৫ বছর কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বাড়বে। বর্তমানে কর্মক্ষম জনসংখ্যা ১০ কোটি ৫৬ লাখ, যা মোট জনসংখ্যার ৬৬ শতাংশ। ২০৩০ সালে এটি বেড়ে দাঁড়াবে ১২ কোটি ৯৮ লাখে, যা মোট জনসংখ্যার ৭০ শতাংশ হবে।
আমাদের দেশে তরুণদের কাজে লাগানোর সহজ উপায় হলো প্রথমত, তাদের উপযুক্ত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনশক্তি হিসেবে গড়ে তোলা। আর দ্বিতীয়ত, তাদের মেধা ও ডিপ্লোমা শিক্ষার সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার। ইউরোপ, আমেরিকা, চীন ও জাপানসহ যেসব দেশ দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নতি করেছে, তারা তাদের জনশক্তি ডিপ্লোমা শিক্ষার দ্বারা সদ্ব্যবহার করেছে দেশের ভেতরে ও বাইরে। এমনকি আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত ও শ্রীলংকাও ডিপ্লোমা শিক্ষার ক্ষেত্রে বেশ সাফল্য দেখিয়েছে।
ইউরোপ অঞ্চলে জনমিতিক সুযোগ সৃষ্টি হতে সময় লেগেছিল ১০০ থেকে ১২০ বছর। কিন্তু এশিয়া ও প্রশান্তমহাসাগরীয় অঞ্চলে এ সুযোগ তৈরি হয়েছে মাত্র ৩০ বছরে। ইউএনডিপির এশিয়া-প্রশান্তমহাসাগরীয় অঞ্চলের মুখ্য অর্থনীতিবিদ থানজাভাল পালানিভাল জানিয়েছেন, এ অঞ্চলের দেশগুলোতে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা ৬৮ শতাংশ ও নির্ভরশীল মানুষে সংখ্যা ৩২ শতাংশ। এই কর্মক্ষম ও নির্ভরশীল মানুষের বর্তমান হার সম্পর্কে তিনি বলেছেন, এ অঞ্চলের দেশগুলোতে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি এবং ইতিহাসের যেকোনো সময়ের তুলনায় তাদের মধ্যে খুব কমসংখ্যকই নির্ভরশীল, যা প্রবৃদ্ধি বাড়াতে সহায়তা করছে।
এখন বিপুলসংখ্যক কর্মক্ষম মানুষ শ্রমবাজারে আসছে। জনমিতিক সুযোগ কাজে লাগাতে বাংলাদেশের প্রয়োজন চামড়া, ওষুধ, টেক্সটাইলসহ রপ্তানিনির্ভর শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ানো। বাংলাদেশ বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষায় লক্ষণীয় উন্নতি করেছে। তবে ডিপ্লোমা শিক্ষায় এখনো চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আরো বেশি সম্পদ শিক্ষা খাতে ব্যয় করতে হবে, যেন তরুণরা ডিপ্লোমা গ্রহণ করে ভবিষ্যতে আকর্ষণীয় কর্মসংস্থানে নিজেদের নিয়োজিত করতে পারে। বাংলাদেশের যে বিশাল শ্রমবাজার তৈরি হয়েছে এবং হচ্ছে তা কাজে লাগানোর জন্য সবচেয়ে বেশি জোর দিতে হবে দক্ষ জনগোষ্ঠী সৃষ্টিতে বিনিয়োগ এবং বহুমুখী শিল্পায়নের ওপর। এর মধ্যে রয়েছে সর্বজনীন উচ্চমানের ডিপ্লোমা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা, অধিকসংখ্যক মানসম্পন্ন চাকরি ও জীবিকার ব্যবস্থা, উৎপাদনশীল বিনিয়োগে আরো সঞ্চয়ের জোগান, নারীর সমঅংশগ্রহণ অর্জন, তরুণদের বিদ্যালয় থেকে কর্মজীবনে প্রবেশের বিষয়টি সহজ করা, প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবার সমন্বয়, নগরায়ণ নিশ্চিত করা।
বিপুলসংখ্যক কর্মক্ষম মানুষ যেমন আমাদের আশাবাদী করে, তেমনি রাষ্ট্রের দায়িত্বও বেড়ে যায়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে কর্মক্ষম মানুষকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো। উন্নতি ঘটানোর জন্য দরকার এসব মানুষের কর্মদক্ষতা বাড়ানো এবং যথাযথ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে তাদের সেখানে নিয়োজিত করা। দক্ষতা আর মেধা থাকলে তুলনামূলক কমসংখ্যক মানুষ নিয়েও যে একটি দেশ উন্নয়নের মহাসড়কে উঠতে পারে, তার বহু নজির রয়েছে। দেশে যে হারে তরুণ জনসংখ্যা বাড়ছে সে হারে কর্মসংস্থান হচ্ছে না। চাহিদা অনুযায়ী ডিপ্লোমাপ্রাপ্ত মানবসম্পদ তৈরি হচ্ছে না। দেশের অর্থনীতি এখনো মূলত নিম্ন দক্ষতার মানুষের কাজের ওপর নির্ভরশীল হয়ে আছে। সম্পদের তুলনায় জনসংখ্যা বেশি হওয়ার কারণে শ্রম উদ্বৃত্ত দেখা দিয়েছে। এর ফলে কর্মহীন ব্যক্তির সংখ্যা বেড়েছে। জনবিজ্ঞানীরা আয়ুষ্কাল বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, যে সব দেশের গড় আয়ু ৬৫ থেকে ৭০ বছর তাদের ক্ষেত্রে কর্মক্ষমতার ব্যপ্তি ১৮ থেকে ৬০ বছর। এ সময় একজন লোক নিজ দেশে কর্মহীন থাকলে বা কাজ প্রাপ্তির সম্ভাবনা কম থাকলে তবে বিদেশে পাড়ি দিয়ে নিজ কর্মক্ষমতাকে ব্যবহার করে অধিক অর্থ উপার্জন করতে চায়। এ অবস্থায় সরকার বিভিন্ন দেশের সাথে চুক্তি করে আয়া, বুয়া, ঝাড়–দার, সুইপার, নির্মাণ শ্রমিক পদে ওই সব দেশের জনসংখ্যা প্রেরণ করে। এ ক্ষেত্রে ডিপ্লোমা শিক্ষায় দক্ষতা বাড়াতে পারলে প্রবাসেও দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রার পরিমাণ কয়েক শ গুণ বাড়ানো যেত।
আমাদের দেশে শিক্ষার হার বাড়লেও চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনশক্তি গড়ে তুলতে পারেনি। আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা যুগের চাহিদা মেটাতে পারছে না বলেই বিশ্বে শিক্ষিত বেকারের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষে। শিক্ষা ক্ষেত্রে অব্যবস্থাপনা এবং সঠিক শিক্ষার অভাবে শিক্ষার্থীদের জ্ঞানের পরিধি লোপ পাচ্ছে। এ ব্যাপারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকমন্ডলীকে আরো সচেতন ও আন্তরিক হতে হবে শিক্ষাদানের বিষয়ে। শিক্ষাকে বাণিজ্যিক হিসেবে না দেখে, জ্ঞানদানের উপাদান হিসেবে দেখতে হবে। পাশাপাশি প্রতিবছর বর্ধিতহারে যে তরুণরা শ্রমবাজারে আসছে, তাদের কাজে লাগাতে হলে শিক্ষাব্যবস্থায় যেমন বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে হবে, তেমনি বাড়াতে হবে কর্মসংস্থানের পরিধিও। বর্তমানে দেশে প্রতিবছর ছয় লাখ লোকের কর্মসংস্থান হয় বলে পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। বছরে প্রায় ২৪ লাখ তরুণ থাকে দিকনির্দেশনাহীন। ফলে ২ কোটি পূর্ণ বেকার ১ কোটি অর্ধ বেকারের বোঝা জাতি বহন করে আসছে।
শ্রমশক্তিকে পেশা ও পণ্যভিত্তিক ডিপ্লোমা শিক্ষায় শিক্ষিত করতে না পারলে জনসংখ্যাতাত্ত্বিক সুবিধা (ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট) বোঝা হয়ে দেখা দিতে পারে। বর্ধিত কর্মশক্তির সুযোগ ও সম্ভাবনা কাজে লাগাতে চাই ডিপ্লোমা শিক্ষা প্রসারের পরিকল্পনা ও তার যথাযথ বাস্তবায়ন। বিংশ শতকে দুটো তাত্ত্বিক বিতর্ক মোকাবেলা করেছে বংলাদেশ। একটির নাম উপনিবেশ থেকে মুক্তির লড়াই। সেটি সফল পরিণতি পেয়েছে। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্টের ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। দ্বিতীয় বিতর্কটি হলো ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থা। বিংশ শতকে পৃথিবীর বহু দেশে রাষ্ট্র কাঠামো বিন্যস্ত করা হয়েছে ডিপ্লোমা শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় যে কয়টি দেশ সফলতার পরিচয় দিয়েছে, তার সব কটির শিক্ষাকে ডিপ্লোমা নির্ভর করেছে।
ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থের ঊর্ধ্বে রাষ্ট্রনেতৃত্ব যখন পরিচালিত হয়, এমন উন্নত চিন্তাধারা থেকে সত্যিকারের প্রগতির পথে যাত্রা শুরু হয়। আমাদের শুরু করতে হবে কর্মকেন্দ্রিক ডিপ্লোমা শিক্ষাকে নির্ভরশীলতার প্রতীক ভেবে। আমরা চাই, বিপুলসংখ্যক কর্মক্ষম জনসংখ্যাকে সঠিকভাবে কাজে লাগানোর জন্য সরকার সচেষ্ট হবে। দেশের বিদ্যমান আর্থসামাজিক বাস্তবতায় কাজটি চ্যালেঞ্জিং। সরকার চ্যালেঞ্জটি দৃঢ়তার সঙ্গে মোকাবেলা করবে এটা আমাদের আশা। যথাযথ ডিপ্লোমা শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ পেলে এবং সঠিক সুযোগ দেওয়া হলে এ দেশের তরুণরা অনেক দুরূহ কাজও সমাধা করতে পারে তার নজির অনেক রয়েছে।
এখন তরুণদের মনে আত্মসচেতনাবোধ তৈরি করতে হবে। দেশ ও জাতির উন্নয়নে নিজেদের নিয়োজিত করতে হবে কায়মনোবাক্যে। এ ব্যাপারে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য বিভাগকে আরো সতর্ক হতে হবে। দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আরো গতিশীল ও দেশাত্মবোধে দীক্ষিত করতে এবং আত্মনির্ভরশীল জাতি হিসেবে গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ এ দুটি বিভাগকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। প্রতিটি সেক্টরে ভেজাল প্রতিরোধে যার যার অবস্থান থেকে আরো সচেতন হতে হবে। সঠিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে নির্ভেজাল করতে পারলে বিবেকসম্পন্ন জাতি গড়ে উঠবে। আর দেশ হবে ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত, সন্ত্রাসমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত, ভেজালমুক্ত বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ।

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

২০ জুলাই ২০১৯/সত্যের সৈনিক

Leave A Reply

Your email address will not be published.