অনলাইন বাংলা সংবাদ পত্র

পরিবহন এখন সর্বনাশী যন্ত্র! -মো. মোশাররফ হোসেন

একটি দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হচ্ছে উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা। যে দেশে যোগাযোগব্যবস্থা যতটা উন্নত, সে দেশের অর্থনীতির ভিত ততটাই মজবুত। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৮ বছরেও আমরা জনগুরুত্বপূর্ণ এই যোগাযোগব্যবস্থাকে উন্নত ও স্বচ্ছ করতে পারিনি, যা দেশ ও জাতির জন্য বড়ই দুর্ভাগ্যের বিষয়। গুরুত্বহীনতার কারণে এ দেশের পরিবহন খাত এতটাই নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে যে অদক্ষ চালকদের হাতে গাড়ি তুলে দেওয়ার কারণে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে অজস্র পরিবহন আর অকালে ঝরে যাচ্ছে স্বপ্নময় হাজারো রাজীবের প্রাণ। শুধু তা-ই নয়, লাইসেন্সহীন অদক্ষ চালকদের বেপরোয়া গাড়ি চালনার কারণে প্রতিবছর দেশে ৪ হাজার ৯৭৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৩৯৭ জন নিহত ও ১৬ হাজার ১৯৩ জন আহত হয়ে পঙ্গুত্বের অভিশাপ নিয়ে দুর্বিষহ জীবনযাপন করছে।

একটি দুর্ঘটনা একটি পরিবারকে সারা জীবনের জন্য দুঃখের প্রদীপ ধরিয়ে দেয়। এতে নিঃশেষ হয়ে যায় তাদের সাজানো-গোছানো স্বপ্নের সংসার, বিধ্বস্ত হয় গোটা পরিবার। পাশাপাশি এর প্রভাব পড়ে সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়নে। যেমন : সড়ক দুর্ঘটনায় বছরে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা!

বর্তমানে সড়ক দুর্ঘটনার সময়-কালভেদে তারতম্য ঘটে। যেমন ঈদে, শীতকালে, বর্ষাকালে সড়ক দুর্ঘটনা বৃদ্ধি পায় অস্বাভাবিকভাবে। বর্ষাকালে সড়ক দুর্ঘটনার সঙ্গে যুক্ত হয় লঞ্চ দুর্ঘটনাও, যা স্মরণকালের ভয়াবহতা ডেকে আনে। এর বড় কারণ দেশের জনসংখ্যা যে হারে বাড়ছে, সেই হারে বাড়ছে না আধুনিক বা সহজতর যানবাহন ব্যবস্থা। গ্রামের কৃষিতে লাভ না পাওয়ায় এবং স্থানীয়ভাবে কোনো কলকারখানা গড়ে না ওঠায় বেকারত্বের একটি বিরাট অংশ কাজের সন্ধানে বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো ছুটে চলে শহরের দিকে। সেখানে গিয়েও তাদের যেন নিস্তার নেই। শহর বা শহরের বাইরের রাস্তাঘাট বা যানবাহনে যাতায়াতের ভালো ধারণা না থাকায় এবং শহরে আধুনিক যানচলাচল পদ্ধতি বা নিয়মনীতি না থাকায় গ্রামের ওই সহজ-সরল মানুষগুলোই বেশি সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে অকালে মৃত্যুবরণ করে।

সংবাদমাধ্যমগুলোতে চোখ পড়লেই দেখি সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াবহ চিত্র। এ ধরনের করুণ মৃত্যুর কোনো শান্তনা নেই। বিধাতার অপার করুণায় কালেভদ্রে যারা বেঁচে যায়, তারা পঙ্গুত্ববরণ করে আজীবনের জন্য করুণার পাত্র ও সমাজে বোঝা হয়ে দুর্বিষহ জীবন অতিবাহিত করে। ধারণা করা হচ্ছে, ট্রাফিকব্যবস্থার হতশ্রী অবস্থা ও চালকদের বেপরোয়া মনোভাব অধিকাংশ সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী। পথচারীদের অজ্ঞতার কারণে ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পারাপারের সময়ও দুর্ঘটনা কখনো কখনো অনিবার্য হয়ে পড়ে।

ভয়াবহ এ সড়ক দুর্ঘটনারোধে রাষ্ট্রকেই অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে। সড়ক পরিবহন আইন- ২০১৬-তে সড়ক দুর্ঘটনাকে অপরাধ ও দণ্ডবিধিতে অন্তর্ভুক্ত করে দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রাখতে হবে। রাস্তার অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও ট্রাফিকব্যবস্থার আধুনিকায়ন করতে হবে।

বাংলাদেশের ৩৪৯২ কি.মি. রাজপথ ও ৪২৬৮ কি.মি. আঞ্চলিক পথ। বর্তমান সরকার সড়কের অবকাঠামোগত লক্ষণীয় উন্নয়ন করেছে, যা অস্বীকার করার কোনো জো নেই। কিন্তু প্রতিদিন অতি সড়ক দুর্ঘটনার কারণে সরকারের এ উন্নয়ন এখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে দেখা দিয়েছে। প্রতি বছর ঈদে মানুষ নাড়ির টানে আর মাটির মায়ায় ছুটে চলে শেকড়ের কাছে। গত বছর ঈদুল ফিতরের ছুটিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। এর ভয়াবহতা ক্রমেই বাড়ছে যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণে।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী এশিয়ার প্যাসিফিক অঞ্চেলের ১২টি দেশের মধ্যে প্রতি ১০ হাজার যানবাহনে বাংলাদেশে নিহতের হার সর্বোচ্চ এবং এ সংখ্যা ১৬৯ জন। প্রাণসংহারি সড়ক দুর্ঘটনা দেশের অর্থনীতির জন্যও ডেকে আনছে সর্বনাশ। এ ক্ষেত্রে  ক্ষতির পরিমাণ মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বা জিডিপির দুই শতাংশ।

কিছুদিন পূর্বে এআরআই আয়োজিত ‘দুর্ঘটনা হ্রাসে কৌশলগত পরিকল্পনা : যৌথ গবেষণা ও অনুধাবন’ শীর্ষক সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেন। তিনি বলেন, দুর্ঘটনার কারণে বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। দুর্ঘটনায় জানমালের ক্ষতি ও দুর্ঘটনা থেকে সৃষ্ট যানজট অর্থনীতিকে বাধাগ্রস্ত করছে। দুর্ঘটনা হ্রাসে সরকার পদপেক্ষ নিলেও সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাব ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যকার সমন্বয়হীনতার অভাবে এ ক্ষেত্রে আশানুরূপ অগ্রগতি হচ্ছে না।

এ ছাড়া লক্কড়ঝক্কড় যানবাহনের পাশাপাশি অদক্ষ চালক, এককথায় সড়ক অব্যবস্থাপনা প্রকট। চালকদের সঠিক প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স ছাড়া সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে আনা অসম্ভব ব্যাপার। বাংলাদেশের সড়কে অবৈধ হাট-বাজারের জন্য ২৮ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা হয়, আর রাস্তার মোড়ের জন্য হয় ১৮ শতাংশ। তা ছাড়া গাড়ি চালানো অবস্থায় চালক মোবাইল ও ইয়ারফোন ব্যবহার করা এবং প্রতিটি সড়কে নসিমন, ভটভটিসহ নানা রকমের ইঞ্জিনচালিত পরিবহন দুর্ঘটনার বিরাট কারণ। এজন্য প্রয়োজন স্বল্পগতিসম্পন্ন গাড়ির জন্য আলাদা রাস্তা করে দেওয়া। সড়ক দুর্ঘটনার জন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রে চালকদের বেপরোয়া গাড়ি চালানো আর ওভারটেকিং দায়ী হলেও তাদের জবাবদিহিতার মধ্যে আনার কোনো উদ্যোগই নেই। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, বাস-ট্রাক মালিক ও চালকদের শক্তিশালী সংগঠনের আন্দোলনের ভয়ে সরকার শক্ত অবস্থান নিতে ব্যর্থ হচ্ছে! আবার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে পর্যাপ্ত হাইওয়ে পুলিশ না থাকা, যা আছে তাদেরও দায়িত্ব অবহেলা ও উদাসীনতা এবং তাদের অনেককে নানা কায়দায় ম্যানেজ করে চালকরা আইন অমান্য করতে সাহস পাচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে আইনের ফাঁক দিয়ে ঘাতক চালকরা পার পেয়ে যাচ্ছে। এসব কারণে সড়ক দুর্ঘটনায় যেভাবে জীবন নাশ হচ্ছে, তা একটা দেশ ও জাতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক।

সড়ক দুর্ঘটনারোধে সরকার বহুমুখী যোগাযোগব্যবস্থা চালু করলে দেশের চলমান সমস্যার সমাধান হবে বলে মনে হচ্ছে। যেমন আধুনিক রেলওয়ে পরিবহন, সড়ক পরিবহন, বিমান ও নৌ-পরিবহনসহ এগুলোকে সমান্তরালভাবে পরিচালনা করা। তার মধ্যে জনবহুল দেশ হিসেবে যানজট ও সড়ক দুর্ঘটনারোধে সরকার ইচ্ছা করলে রেলওয়েকে আধুনিকায়নের মাধ্যমে দেশের চলমান সমস্যার সমাধান করতে পারে। এখন সর্বাগ্রে প্রয়োজন যোগাযোগ ও পরিবহন খাতটির প্রতি সুদৃষ্টি দেওয়া এবং যথাযথ আইনের মাধ্যমে তা নিয়ন্ত্রণ করা। তাতে অন্তত সড়ক দুর্ঘটনা কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব। এটি এখন সর্বস্তরের সাধারণ জনগণের প্রত্যাশা।

লেখক : সাংবাদিক ও সমাজবিশ্লেষক

১৮ এপ্রিল/সত্যের সৈনিক/সুলতান মাহমুদ

Leave A Reply

Your email address will not be published.