অনলাইন বাংলা সংবাদ পত্র

বিজয় দিবসের ভাবনা হোক সোনার বাংলা গড়ার অঙ্গীকার -এম এ মোতালিব

আজ ১৬ই ডিসেম্বর। মহান বিজয় দিবস। বাঙালি জাতির বিজয়ের দিন আজ, যে দিনটি আমাদের উপহার দিয়েছিলেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, এ দেশের প্রতিটি মানুষের প্রাণপুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব পাকিস্তানি হায়েনাদের কালো থাবা থেকে এই সবুজ-শ্যামল ভূখণ্ডটিকে মাত্র নয় মাসে ছিনিয়ে এনেছিল লাল-সবুজের পতাকাকে। তাই তো বীরের জাতি হিসেবে বাঙালি জাতির আত্মপ্রকাশের দিন আজ। আজ পৃথিবীর মানচিত্রে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অস্তিত্ব প্রকাশের দিন। পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মাতৃভূমিকে মুক্ত করতে প্রাণ উৎসর্গ করা যুদ্ধজয়ের আনন্দ সত্যি অতুলনীয়। ৪৭ বছর আগে এই দিনে বর্বর পাকিস্তানি বাহিনী তাদের হাতের অস্ত্র ফেলে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়েছিল বিজয়ী বাঙালি জাতির সামনে। তারা স্বাক্ষর করেছিল পরাজয়ের সনদে। এ বিজয় গর্বের, এ বিজয় বাঙালির অস্তিত্বের, এ বিজয় সত্যের। তাই তো প্রতিবছর এই দিনে প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে বেজে উঠে বিজয়ের গান, বিশ্বের দরবারে মাথা ‍উঁচু করে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণা।
প্রতিবেছরের মতো আজও এই দিনে সারা দেশের মানুষের পাশাপাশি সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকা বাঙালিরা মহান বিজয় দিবসে আনন্দে মেতে উঠবে। একই সঙ্গে স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করা অকুতোভয় বীর সন্তানদের গভীর বেদনা ও পরম শ্রদ্ধায় স্মরণ করবে কৃতজ্ঞ জাতি। শ্রদ্ধা জানাবে সম্ভ্রম হারানো মা-বোনদের। সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে সকাল থেকে ঢল নামবে লাখো জনতার। শ্রদ্ধা-ভালোবাসা নিয়ে শহীদদের উদ্দেশে পুষ্পাঞ্জলি নিবেদন করবে শত কোটি মানুষ। বঙ্গবন্ধুর বজ্রকণ্ঠের ভাষণ আর মুক্তিযুদ্ধের সময়ের জাগরণী গানে মুখরিত হবে পাড়া-মহল্লা, গলি থেকে রাজপথ।
পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ২৪ বছরের মুক্তির সংগ্রাম ও একাত্তর সালের ৯ মাসে অকুতোভয় বাঙালির সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের পথ বেয়ে এসেছে কাঙ্ক্ষিত এ বিজয়। সাম্প্রদায়িক দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে সৃষ্ট পাকিস্তানে ১৯৪৭ সালেই বাঙালির ওপর প্রথম আঘাত এসেছিল। রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার ঘোষণা দিয়েছিল পাকিস্তানি শাসকরা। ১৯৫২ সালে বুকের তাজা রক্তে রাজপথ রাঙিয়ে বাংলার বীর সন্তানরা মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা করে বিশ্বে এক অনন্য নজির সৃষ্টি করেছিল। ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে স্বাধিকারের চেতনার যে স্ফূরণ ঘটেছিল, কালক্রমে তা সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে রূপ নেয়।
বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার জন্য চূড়ান্ত যুদ্ধে অংশ নিতে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে তোলেন। তিনি ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে লাখো জনতার সামনে দেওয়া ঐতিহাসিক ভাষণে শত্রুদের মোকাবিলা করার জন্য যার কাছে যা আছে তা নিয়ে সবাইকে প্রস্তুত থাকতে বলেন। ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ বঙ্গবন্ধুর দীপ্তকণ্ঠের এ ভাষণ বাঙালি জাতিকে শক্তিতে রূপান্তর করে। তাই তো পাক সেনাদের কামানের গোলাও অদম্য বাঙালিকে দমাতে পারেনি।
পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে কাপুরুষের মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছিল নিরস্ত্র নিরপরাধ ঘুমন্ত বাঙালির ওপর। বর্বর হত্যাযজ্ঞে মেতে উঠেছিল তারা। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়ি থেকে সেই রাতেই তারা বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে। কিন্তু তার আগেই বঙ্গবন্ধু বাঙালির ওপর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যা শুরুর বার্তা দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। সেই ঘোষণায় তিনি বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে জনসাধারণের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান।
বঙ্গবন্ধুর সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিরোধ সংগ্রাম গড়ে তোলে বীর বাঙালি। দীর্ঘ ৯ মাস সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালের এই দিনে পৃথিবীর মানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র—বাংলাদেশের। লাল-সবুজ পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে ধরে বিজয়ী বাঙালি জাতি। সেই পতাকা উঁচিয়ে আজও প্রগতির পথে চলেছে বাঙালির অভিযাত্রা।
আমাদের মনে প্রায়ই প্রশ্ন ওঠে, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশ আমাদের পরে স্বাধীনতা অর্জন করলেও তার চেয়ে আজ আমরা কেন পিছিয়ে আছি? আসলে স্বাধীনতা অর্জনের পর আমাদের অনেক চড়াই-উত্রাইয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। একাত্তরের ঐক্য আমরা নানা কারণে ধরে রাখতে পারিনি। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম লক্ষ্য গণতান্ত্রিক মুক্তি বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। আবার জনবহুল ও সীমিত সম্পদের এই দেশকে স্বয়ম্ভর করে তোলার কাজটিও সহজ ছিল না। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের জন্যও পার করতে হয়েছে কঠিন সময়। কিন্তু সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশ যে হারে উন্নতি লাভ করছে, অর্থনৈতিক উন্নয়নের মহাসড়ক অতিক্রম করছে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার হাত ধরে, তা অব্যাহত রাখতে পারলে বাংলাদেশ অচিরেই এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হবে। এজন্য আমাদের মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও লক্ষ্য বাস্তবায়ন এবং নিরবচ্ছিন্ন উন্নয়ন ধারায় থাকতে হবে স্থির ও অবিচল। ধরে রাখতে হবে কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি ও মানবসম্পদ সূচকে আমাদের অগ্রযাত্রা। ধরে রাখতে হবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, নিশ্চিত করতে হবে সুশাসন। শক্তিশালী করতে হবে সকল সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে। তাহলেই আমরা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তুলতে পারব ইনশাআল্লাহ।

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক
ই-মেইল : [email protected]

১৬ ডিসেম্বর ২০১৮/সত্যের সেনিক/এমএএম

Leave A Reply

Your email address will not be published.