অনলাইন বাংলা সংবাদ পত্র

মাদক ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি -এম এ মোতালিব

গত ২ সেপ্টেম্বর কালের কণ্ঠ পত্রিকায় “১ মিনিট দাঁড়িয়ে ‘মাদককে না’ বলবে দেশ” শিরোনামে লেখাটি পড়ে মনে হলো মাদকের বিরুদ্ধে তৎপরতা শুরু হয়েছে দায়িত্বশীল মহলে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) উদ্যোগে চলতি মাসের যেকোনো এক দিন ঢাকাসহ সারা দেশে একযোগে ‘মাদককে না’ বলবে সব মানুষ। এক মিনিটের জন্য পালিত হবে এ কর্মসূচি। আইনের প্রয়োগের পাশাপাশি যার যার অবস্থান থেকে মাদকের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে এ পদক্ষেপ নিয়েছে ডিএনসি।
নিঃসন্দেহে উদ্যোগটি নিতান্তই ইতিবাচক। কিন্তু এর মাধ্যমে কি মাদক নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব! মাদক এক ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি। যুবসমাজকে ধ্বংস করার মোক্ষম হাতিয়ার হলো এই মাদক। মাদক খারাপ, মাদক জীবনকে নিশ্চিত ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়, মাদকাসক্ত ব্যক্তিরা সমাজে সর্বস্তরে ঘৃণীত-ধীকৃত; এটা জানার পরও মাদকের ব্যবহার কিন্তু দিন দিন বৃদ্ধিই পাচ্ছে। কোনোক্রমেই এটাকে রোধ করা যাচ্ছে না। একই তারিখে একই পত্রিকার আরেকটি শিরোনাম চোখ ধাঁধিয়ে দিল। ‘ভুয়া সিকিউরিটি সার্ভিসের আড়ালে ইয়াবা পাচার, আটক ৬’ লেখাটি পড়ে জানা গেল, র‌্যাব জানায়, এই চক্রের সদস্যরা ভুয়া সিকিউরিটি সার্ভিসের আড়ালে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের চোখে ধুলো দিয়ে কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে ঢাকায় ইয়াবার বড় বড় চালান নিয়ে আসত। এই টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে অহরহ মাদক প্রবেশ করে, এটি নতুন ঘটনা নয়। জনমনে প্রশ্ন হলো, এটাকে কেন রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না? কোন শক্তি এর পেছনে কাজ করছে দেশের যুবসমাজকে ধ্বংস করার জন্য, যা সরকারও রোধ করতে পারছে না! এখনই এটাকে রোধ করতে না পারলে পুরো জাতি এই মাদকের করালগ্রাসে নিমজ্জিত হবে।
গা শিউরে ওঠে প্রায় প্রতিনিয়তই মাদক নিয়ে বিভিন্ন মিডিয়ার খবর। ‘খাত’ নামে মাদকের আরেকটি চালান বাংলাদেশ থেকে যাচ্ছিল ইউরোপ-আমেরিকায়। খবরটি পড়ে জানা যায়, দেশের ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো জব্দ করা ‘খাত’ বা নিউ সাইকোট্রফিক সাবস্টেনসেস (এনপিএস) ক্যাটাগরির বিশাল মাদক চালানটির গন্তব্য ছিল আমেরিকা ও ইউরোপের দেশ। ইথিওপিয়ার নাগরিক আদ্দিস আবাবার জিয়াদ মোহাম্মদ ইউসুফ নামের এক আন্তর্জাতিক মাদক কারবারির কথামতো বাংলাদেশি মোহাম্মদ নাজিম (৪৭) মাদক ‘খাত’ সংগ্রহ করে। খবরে জানা যায়, এর নেপথ্যে রয়েছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেট শব্দটি মারাত্মক। প্রতিটি সিন্ডিকেট দেশকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। মাদকের সিন্ডিকেট তো আরো ভয়াবহ।
মাদকের এই ভয়াবহ ছোবলে পড়ে যুবসমাজ ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আজকের তরুণরাই ভবিষ্যতে দেশ ও জাতির কর্ণধার। এসব তরুণকে সত্য, সঠিক ও সুন্দরভাবে গড়ে তোলার মধ্যে দেশের কল্যাণ নিহিত। এদের বিপথগামিতার অর্থ দেশ ও জাতির অনিবার্য বিপদ। আমাদের সমাজ নানাভাবে ব্যাধিগ্রস্ত। মাদক সমাজের তরুণ থেকে শুরু করে ছড়িয়ে পড়েছে কিশোরদের মাঝেও। ফেনসিডিল, গাঁজা, ইয়াবাসহ নানাবিধ মাদকের ব্যবহার দিন দিন বেড়েই চলছে ব্যাপকভাবে। শহর থেকে অজপাড়াগাঁ পর্যন্ত এমন কোনো জায়গা নেই, যেখানে মাদকের বিস্তৃতি ঘটেনি। শহরের অলিগলি থেকে গ্রামের আনাচে-কানাচে বিস্তার ঘটেছে ইয়াবার। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী, তরুণ-তরুণী, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবীদের অনেকেই এখন ইয়াবায় আসক্ত বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। আর তাই তো এর কেনাবেচাও বেড়ে চলেছে পাল্লা দিয়ে। মাদক শুধু একজন ব্যক্তি কিংবা একটি পরিবারের জন্যই অভিশাপ বয়ে আনে না, দেশ ও জাতির জন্যও ভয়াবহ পরিণাম ডেকে আনে। নানা রকম প্রাণঘাতী রোগব্যাধি বিস্তারের পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিও খারাপ করে তুলছে এই মাদক। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতায় দেশের অভ্যন্তরে মাদকের বেচাকেনা এবং বিভিন্ন সীমান্তপথে দেশের অভ্যন্তরে মাদকের অনুপ্রবেশ নিয়ে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও দীর্ঘদিনের। দেশের কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির ছত্রচ্ছায়ায় মাদকদ্রব্য বেচাকেনার বিষয়টি বলতে গেলে অনেকটা ওপেনসিক্রেট। তাই তো মাদক এখন আর শুধু অলিগলি, ঘুপচিতে নয়, এর বিস্তার ঘটেছে ভদ্রসমাজেও। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও মাদকের ভয়াবহ বিস্তার ঘটেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। বিভিন্ন সময় পুলিশি অভিযানে মাদকদ্রব্য আটক ও এর সঙ্গে জড়িতদের আটকের কথা শোনা গেলেও মাদক ব্যবসার নেপথ্যে থাকা ‘গডফাদার’দের আটক করা হয়েছে কিংবা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে এমন কথা শোনা যায় না বললেই চলে।
মাদকের ভয়াবহতা রোধে কার্যকর কঠোর প্রয়োগ না থাকায় দেশের অভিভাবকরা আজ চিন্তিত তাদের সন্তানদের নিয়ে। মাদকের হিং¯্র ছোবল থেকে সারা জাতি নিষ্কৃতি চায়। কিন্তু আইনের যথাযথ কার্যকর প্রয়োগ না থাকায় এর ভয়াবহতা বেড়েই চলেছে। সেই সাথে বেড়ে চলেছে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠাও। এই যে মাদক নিয়ে এত এত ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে, শুধু ‘মাদককে না’ বলার মাধ্যমে এর ভয়াবহতা রোধ করা কি সম্ভব? এ জন্য প্রয়োজন দেশের সর্বস্তর থেকে কঠোর প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে মাদকের ছোবল থেকে দেশের যুবসমাজকে রক্ষা করতে আরো আন্তরিক ও কঠোর ভ‚মিকায় অবতীর্ণ হতে হবে। পাশাপাশি সর্বস্তরের সাধারণ জনগণকে আরো সচেতন হবে। অভিযোগ রয়েছে, শহরের আনাচে-কানাচে মাদক কেনা-বেচা হয়, যার ক্রেতা উঠতি বয়সী স্কুল-কলেজগামী কিশোর-যুবসমাজ। মাদকের এই ভয়াবহতার হাত থেকে এদের রক্ষা করার দায়িত্ব প্রতিটি নাগরিকের। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আন্তরিক হলে এবং সাধারণ নাগরিকের সহযোগিতা পেলে এটা রোধ করা কঠিন কিছু নয়। পাশাপাশি প্রয়োজন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, মসজিদ-মাদ্রাসায়, বিভিন্ন সেমিনার-শিম্পোজিয়ামের মাধ্যমে মাদকের কুফল সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা করা। যুবসমাজের মাঝে এর মারাত্মক ক্ষতিকারক দিক তুলে ধরা এবং এর ভয়াবহতার কথা তাদের মন-মগজে ঢুকিয়ে দেওয়া। সর্বোপরি অভিভাবকদের সচেতন হওয়া। বিষ খেলে মানুষ মারা যায়, এটা জানার পর কেউ নিশ্চয়ই ওই বিষের দিকে হাত বাড়াবে না।

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক
ই-মেইল : [email protected]

০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮/সত্যের সৈনিক/সুলতান মাহমুদ

Leave A Reply

Your email address will not be published.