অনলাইন বাংলা সংবাদ পত্র

শিক্ষার যথার্থ মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠিত হোক -এম এ মোতালিব

একটি জাতির উন্নয়নে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই এবং সে শিক্ষাটা হতে হবে প্রকৃত শিক্ষা। বিবেকবোধ তৈরির শিক্ষা। কারণ শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড। একটি সভ্য ও আদর্শ জাতি গড়তে হলে, মানবতাবোধসম্পন্ন শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। নেপোলিয়ন বলেছিলেন, ‘তোমরা একটি শিক্ষিত মা দাও, আমি একটি শিক্ষিত জাতি উপহার দেব।’ তিনি যথার্থই বলেছিলেন। প্রতিটি শিক্ষা হতে হবে প্রকৃত শিক্ষা। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, আমরা সেদিকে গুরুত্ব দিতে পারিনি, তা কখনো অর্জনও করতে পারিনি। স্বাধীনতার আটচল্লিশ বছরেও না। মানুষ মানুষের জন্য-এ কথাটি আমরা কখনোই বুকে ধারণ করতে পারিনি। সব সময় নিজের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে এসেছি। স্বার্থপরতার কাছে নিজেকে উৎসর্গ করেছি অবলীলায়। তাই তো একে অন্যের প্রতি আমরা কখনো আন্তরিক হতে পারি না, সহযোগিতা-সহমমির্তা প্রকাশ করতে পারি না। প্রতিটি ক্ষেত্রে নিষ্ঠুর আচরণ পরিলক্ষিত হয়। আমরা কখনোই কোনো সমস্যাকে নিজের করে দেখি না। আমরা প্রত্যেকে অসহায়ের অসহায়ত্ব যদি নিজের করে ভাবতে শিখতাম, তাহলে আমাদের জীবনটা অন্য রকম হতো। আমরা সুসভ্য জাতিতে পরিণত হতে পারতাম নির্দ্বিধায়। এ শিক্ষাটা আমরা কখনোই পাইনি; আজন্মেও না। হয়তো পাওয়া চেষ্টাও করি না। আমরা কখনো কি উপলব্ধি করতে পেরেছি, অসহায়ের অসহায়ত্ব কতটা বেদনাদায়ক? পারিনি। নিজেকে ভুক্তভোগীর জায়গায় উপস্থাপন করলে উপলব্ধি করা যেত। কিন্তু তা আমরা কখনো করি না। ভাবিও না। আসলে এ শিক্ষাটা কোথা থেকে পাওয়ার কথা? পরিবার থেকে, সমাজ থেকে, পরিবেশ থেকে, সর্বোপরি কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে। কিন্তু আমরা আদৌ কি সেটা পেয়েছি বা পাচ্ছি? উত্তরটা হয়তো সবারই জানা।
যেকোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিটি শিক্ষক আন্তরিকতার সঙ্গে যে শিক্ষা দেবেন, সেটাই হবে প্রকৃত শিক্ষা। তাঁদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্যই থাকবে আজকের এই শিশু-কিশোর ছাত্রসমাজই ভবিষ্যতে জাতির দায়িত্বভার গ্রহণ করবে। সুতরাং তাদের সেভাবেই গড়ে তুলতে হবে। তাদের মধ্যে যেন কোনো প্রকার কলুষতা না থাকে, হিংসা-বিদ্বেষ না থাকে, দীনতা না থাকে, সর্বদা সে শিক্ষাই দিতে হবে। স্বার্থপরতার নাগপাস থেকে তাদের এমন ভাবে দূরে সরিয়ে রাখতে হবে, যেন এই অশুভ তৎপরতা তাদের কিছুতেই ছুঁতে না পারে। কিন্তু এই চিন্তাধারা শিক্ষকসমাজে কি কখনোই আমরা দেখেছি বা এখনো দেখছি? যতদূর মনে পড়ে উত্তরটা সন্তোষজনক হবে না।
আজ প্রায় প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দিকে তাকালে যারপরনাই হতাশ হতে হয়। সেখানে শিক্ষার্থীদের যে শিক্ষা দেওয়া হয়, তাদের সঙ্গে যে আচরণ করা হয়, অভিভাবকদের যেভাবে জিম্মি করে রক্ত চোষার মতো চুষে খাওয়া হয়, তা ভাবতে গেলে অবাক হওয়া ছাড়া গত্যন্তর থাকে না। আমরা জানি, প্রতিটি শিক্ষক দেশ গড়ার কারিগর এবং প্রতিটি শিক্ষাক্ষেত্র সেই দক্ষ কারিগরদের বিচরণক্ষেত্র। সেই বিচরণক্ষেত্রটি কতটা স্বচ্ছ ও নির্ভেজাল, তা আমরা নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে দেখলে স্পষ্ট বুঝতে পারব। আমরা প্রত্যেকেই জানি ও বুঝি যে আমাদের প্রায় প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নৈতিকতার দিক থেকে কতটা নিম্নমুখী। সেখানে সর্বদা পরিলক্ষিত হয় যে বিভিন্ন প্রকার অনিয়ম, অনীতি, স্বজনপ্রীতি আর দুর্নীতির আঁখড়া যেন জেঁকে বসেছে। একটি শিক্ষিত গোষ্ঠী দ্বারা যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হচ্ছে, তাদের এ ধরনের অপনীতি সত্যি অবাক করার মতো!
আজ দেশে, বিশেষ করে রাজধানী শহরে প্রায় প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাছে অভিভাবকরা জিম্মি। কাঁড়ি কাঁড়ি টাকার বিনিময়ে প্রকৃত শিক্ষার পরিবর্তে তাঁদের হতাশা ক্রয় করতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। শিক্ষার নামে সেখানে চলছে ব্যাবসায়িক ধান্দাবাজি আর ধোঁকাবাজি। শিক্ষার নামে তারা যেন অর্থোপার্জনের ফাঁদ পেতে বসেছে সর্বত্র। আর শিক্ষাব্যবসায়ীদের পাতা সেই কৌশলী ফাঁদে অভিভাবকমহল জড়িয়ে যাচ্ছে নিরুপায় হয়ে। শিশু শ্রেণি থেকে শুরু করে প্রতিটি শ্রেণিতে যে হারে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে, তা সত্যি অবাক করার মতো। কিন্তু বিনিময়ে অভিভাবকরা কিছুই পাচ্ছেন না। না পারছে তাঁদের সন্তানরা প্রকৃত শিক্ষা, না হচ্ছে তাদের মেধার বিকাশ। তাঁদের সন্তানরা শুধু ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী -এতটুকু পরিচয়ের জন্যই কি সেখানে ভর্তি করানো হয়েছে? অবস্থাদৃষ্টে তা-ই মনে হচ্ছে! খোঁজ নিয়ে এবং ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে জানা যায়, প্রায় প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকমন্ডলী কোনো রকমের দায়সারাগোছের ডিউটি সেরে ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রাইভেট কিংবা কোচিং বাণিজ্যে। এই কোচিংবাণিজ্য তাদের অর্থ উপার্জনের একমাত্র হাতিয়ার। তারা প্রতিটি ছাত্র কিংবা অভিভাবককে এমনভাবে বাধ্য করান যে প্রতিটি বিষয়ে আলাদা শিক্ষক না রাখলে তাঁদের চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়। তাও আবার সে শিক্ষক হতে হবে যে প্রতিষ্ঠানে পড়ে সেই প্রতিষ্ঠানের। তা না হলে জোটে পরীক্ষায় অকৃতকার্যের অদৃশ্য সনদ। একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে যে দেশে, বিশেষ করে রাজধানী শহরের অধিকাংশ মানুষই প্রতিনিয়ত হতাশার শিকার হচ্ছে, তার মধ্যে তিনটি গোষ্ঠীর কাছে তারা বেশি জিম্মি। একটি হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকমন্ডলী, দ্বিতীয়টি চিকিৎসাকেন্দ্র বা চিকিৎসা পেশায় নিয়জিত চিকিৎসক এবং তৃতীয় হলো শহরের বাড়িওয়ালা, কথায় কথায় যাঁরা ভাড়াটিয়াদের হেনস্তা করতে দ্বিধা করেন না। মানবতার চেয়ে তারা অর্থকে বেশি মূল্যায়ন করেন। কারণ একজন ভাড়াটিয়াকে সরাতে পারলেই অন্যত্র তারা ভাড়া বাড়ানোর সুযোগ পান। বাকিটুকু সবারই জানা। সবটির ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। আমরা এর থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে ভয়াবহ খেসারত দিতে হবে এ জাতিকে, যা অপূরণীয় ক্ষতি বয়ে আনবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর। নিশ্চয়ই আমরা কেউ-ই এমনটি চাই না।

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক
ই-মেইল : [email protected]

৫ মে ২০১৯/সত্যের সৈনিক

Leave A Reply

Your email address will not be published.