অনলাইন বাংলা সংবাদ পত্র

চিকিৎসাব্যবস্থার এ নৈরাজ্য কবে দূর হবে! -এম এ মোতালিব

কথায় বলে স্বাস্থ্য সকল সুখের মূল। তাই তো প্রতিটি মানুষের সবার আগে গুরুত্ব দেওয়া উচিত স্বাস্থ্যের প্রতি। তা ছাড়া একটি রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের পাঁচটি মৌলিক চাহিদার মধ্যে অন্যতম হলো চিকিৎসা বা স্বাস্থ্য। সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্যই সবার আগে প্রয়োজন মানুষের চিকিৎসা। আর সঠিক চিকিৎসা নির্ভর করে একজন সৎ ও নিষ্ঠাবান চিকিৎসের ওপর। কারণ তারা যে দিকনির্দেশনা দেবেন, রোগী বা চিকিৎসা প্রার্থীরা তাদের সে দিকনির্দেশনা অক্ষরে অক্ষরে পালন করবেন। কিন্তু বড়ই দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো আমরা সাধারণ জনগণ কেউ-ই একজন চিকিৎসকের কাছে সেবামূলক আচরণ আশা করতে পারি না। তারা প্রতিনিয়ত ব্যবসায়িক মনোবৃত্তি নিয়ে চিকিৎসা প্রদান করেন। সেবার চেয়ে অর্থটাই তাদের কাছে প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। তাই তো দেখা যায় যত্রতত্র হাসপাতাল-ক্লিনিক খুলে বসে তারা ব্যবসায়িক ধান্ধায়। আমাদের দেশের অধিকাংশ ক্লিনিক-হাসপাতাল আজ সাধারণ মানুষের জন্য কসাইখানা ও মরণ ফাঁদে পরিণত হয়েছে। আর ডাক্তারদের মধ্যে বড় একটি অংশ আজ মানবসেবা ও মানবিকতা ভুলে গিয়ে কসাই ও ডাকাতের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। সেবার চেয়ে অর্থটাই তাদের কাছে মুখ্য বিষয়।
সারা দেশে রাস্তার আনাচে-কানাচে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে বিভিন্ন হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। এসব ক্লিনিক ও হাসপাতালে উন্নত চিকিৎসা সেবার নামে চলছে বাণিজ্য। বর্তমানে আমাদের দেশের অধিকাংশ হাসপাতাল-ক্লিনিকের মালিক ও ডাক্তাররা সঠিক চিকিৎসা দেওয়ার পরিবর্তে উপার্জনকেই বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। তারা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে থেকে সাধারণ রোগীদের গলা কাটছেন। রোগীর সামর্থ্যরে দিক বিবেচনা না করে তারা প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন প্রকার পরীক্ষা-নীরিক্ষার মাধ্যমে হাতিয়ে নিচ্ছেন বিপুল অর্থ। অনেক সময় রোগীদের ভয় দিখিয়ে, আতঙ্কগ্রস্ত করে তাদের ইচ্ছামতো চিকিৎসা করাতে বাধ্য করেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক রোগীর অভিভাবক বললেন, আঘাতজনিত কারণে রোগী কাতরাচ্ছিল। সাইনবোর্ডে অনেক বড় বড় ডিগ্রির ফিরিস্তি দেখে গিয়েছিলাম জনৈক ডাক্তারের কাছে। দীর্ঘ সিরিয়ালের পর ভাগ্যের চাকা ঘুরল ডাক্তার দর্শনের। ভেতরে ঢুকে দেখলাম ডাক্তার সাহেব কয়েকজন সহকারী নিয়ে বসে আছেন এবং একজনের সাথে খোশ গল্প করছেন। দেখে মনে হলো তারা শিক্ষানবিশ। তাদের একজন জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে? সমস্যার বিস্তারিত না শুনেই তিনি কয়েকটি ব্লাড টেস্ট, ইউরিনের কয়েক প্রকার টেস্ট ও এক্স-রেসহ একগাদা টেস্ট দ্রুত করাতে নির্দেশ দিলেন। ডিগ্রিধারী ওই ডাক্তার এদিকে ফিরেও তাকালেন না। ওই অভিভাবক বললেন, এ টেস্টগুলো না করালে চিকিৎসাও পাব না। তবু ভালো লাগত যদি ডাক্তার নিজে দেখে এ টেস্টগুলো করাতে বলতেন। এই হলো আমাদের দেশের চিকিৎসাব্যবস্থা। আমি মানি শিক্ষানবিশরাও ভালো। কিন্তু রোগীর সাথে ডাক্তার দু-চারটি কথা বললে, একটু পরামর্শ দিলে রোগীর আত্মতৃপ্তি আসে। একজন ভালো ডাক্তার দেখাতে পেরে তারা তৃপ্তির ঢেঁকুর গেলে। কিন্তু সেটাও যেন তাদের ভাগ্যে জোটে না। এগুলো যেন দেখার কেউ নেই।
এবার নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলছি। ঢাকা শহরে নামকরা এক প্রতিষ্ঠানে গেলাম গ্যাস্ট্রোলিভারের ডাক্তার দেখাতে। এন্তার ডিগ্রি দেখেই তাঁর কাছে যাওয়া। কিন্তু দুঃখের বিষয় সেদিন সিরিয়াল পেলাম না। বলা হলো আগামীকাল রাত সাড়ে ১১টায় আসতে। তখন ছিল রমজান মাস। সিরিয়াল অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে উপস্থিত হলাম। কিন্তু অপেক্ষার পালা আর শেষ হয় না। রোগীকে নিয়ে অস্থিরতায় ভুগছিলাম। অবশেষে ডাক পড়ল রাত ১টা ৪০ মিনিটে। ক্লান্ত রোগী, তার চেয়ে বেশি ক্লান্ত ডাক্তার নিজেই। তিনি রোগীকে বিছানায় শুইয়ে দিলেন। সারা শরীরে তেথিস্কোপ দিয়ে পরীক্ষা করতে লাগলেন। আমি পাশে দাঁড়ানো। ডাক্তারকে সহযোগিতা করছেন তার সহকারী। লক্ষণীয় বিষয় হলো, ডাক্তার এতটাই ক্লান্ত যে রোগীর গায়ে তেথিস্কোপ লাগিয়ে তিনি ঘুমিয়ে পড়ছেন আর পাশ থেকে তার সহকারী ডাক্তারকে গলা খাকারি দিয়ে জাগিয়ে তুলছেন। আরো দেখলাম, প্রেসক্রিপশন করতে গিয়ে ঘুমে তার কলম থেমে যাচ্ছে। তাকে সতর্ক করছেন সহকারী। একসময় তিনি প্রেসক্রিপশনটা লিখে সহকারীর হাতে ধরিয়ে দিয়ে আমাকে তার কাছ থেকে বুঝিয়ে নিতে ইশারা করে তিনি অন্য রোগী দেখতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। সহকারী একগাদা টেস্টের বোঝা আমার ঘাড়ে চাপিয়ে নির্দিষ্ট ফি বুঝিয়ে নিয়ে তিনিও চলে গেলেন ডাক্তারের ঘুম ভাঙাতে। এই হলো আমাদের দেশের অদ্ভুত চিকিৎসার ধরন। আমি বাইরে রোগীর সিরিয়াল নিয়ন্ত্রণকারী ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম এই ডাক্তার বিকেল ৪টা থেকে রাত সাড়ে ৩টা-৪টা পর্যন্ত রোগী দেখেন। অবশ্য ওই দিন আমি সেখান থেকে বিদায় নিয়েছিলাম রাত ২টা ৩০ মিনিটে। তখনো ১০-১২ জন রোগী অপেক্ষা করছিলেন ডাক্তারের। দেখলাম এক দরিদ্র রোগী অনেক কাকুতি-মিনতি করলেন ১০০ টাকা ফি কম দেওয়ার জন্য। বিনিময়ে তাকে অনেক অপমানজনক কথা সহ্য করতে হলো। কত টাকা চাই তাদের! তাদের এই লোভ-লালসা ধ্বংস করছে চিকিৎসা ব্যবস্থাকে। তাদের কাছে সাধারণ রোগীরা অসহায়। যে পরীক্ষা-নীরিক্ষাগুলো দেওয়া হয়, তা না করিয়েও তো উপায় নেই। কারণ এগুলো বোঝার ক্ষমতা বা সাধ্যি সাধারণ জনগণের নেই। দুর্বলতার এই সুযোগে প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে পরীক্ষা-নীরিক্ষার নামে জনগণের পকেট খালি করা হচ্ছে নির্দয়-নিষ্ঠুরভাবে। এখানেই শেষ নয়, একবার মোটা অঙ্কের ফি দিয়ে ডাক্তার দেখাতে হয়, পরবর্তীতে আবার সেই টেস্টের রিপোর্ট দেখাতে গেলেও একই পরিমাণ ফি দিতে বাধ্য হয় রোগীরা। আর শাখের করাতের মতো ডাক্তাররা আসতে-যেতে দুহাতে হাতিয়ে নিচ্ছেন অর্থের ভাণ্ডার। চিকিৎসার নামে এ ধরনের নৈরাজ্য যেন ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলছে। এর পাশাপাশি বর্তমানে আমাদের দেশের হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলোতে তিনটি সমস্যা মহামারি আকার ধারণ করছে।
* ডাক্তার বা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলায় ও ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু।
* সঠিকভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই জীবনকে মৃত ঘোষণা।
* আইসিইউ ও সিসিইউতে লাইফসাপোর্টের নামে রোগীকে আটকে রেখে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায়।
দেশের চিকিৎসা ক্ষেত্রে নৈরাজ্য আর দায়িত্বজ্ঞানহীনতার যেন শেষ নেই। অস্ত্রোপচারের পর পেটের ভিতর ছুরি বা গজ রেখেই সেলাই দেওয়া, অসুস্থ অঙ্গের পরিবর্তে সুস্থ অঙ্গ কেটে ফেলা, দাঁত তোলার নামে শিক্ষানবিশ ডাক্তাররা হাত পাকাচ্ছেন, কখনো কখনো অনেক হাসপাতালে ডাক্তারের পরিবর্তে ওয়ার্ডবয়রাই আবার ডাক্তারের ভূমিকা পালন করছে। জটিল কঠিন অপারেশন করতেও দ্বিধা করছে না তারা। আবার সুযোগ-সুবিধাহীন সরকারি হাসপাতালে একশ্রেণির ডাক্তার, নার্স, আয়া-কর্মচারীর চরম দুর্ব্যবহারের সামনে রোগীরা হয়ে পড়ছেন বড়ই অসহায়।
প্রতিদিন সংবাদপত্র খুললেই দেখা যায় দেশের কোথাও না কোথাও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বা ডাক্তারের অবহেলায় ও ভুল চিকিৎসায় রোগী মারা যাওয়ার খবর; সিজার করতে গিয়ে নবজাতকের নাড়ি-ভূঁড়ি বা অঙ্গ কেটে ফেলার খবর। মেয়াদ উত্তীর্ণ ওষুধ বা ভুল ইনজেকশনের কারণে রোগীর মৃত্যুর খবরও শোনা যায় অবরহ। লক্ষণীয়, অধিকাংশ হাসপাতাল-ক্লিনিকের মালিক ও ডাক্তাররা ঠিক পরিবহন মালিক শ্রমিকদের মতোই বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। যাত্রীরা যেমন গাড়ি চালকদের কাছে জিম্মি হয়ে থাকে, তেমনি রোগীদেরও আজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও ডাক্তারদের কাছে জিম্মি থাকতে হয়। বাংলাদেশে উন্নত সেবাটা এখন শুধু সাইনবোর্ড সর্বস্ব। বাস্তবতা সম্পূর্ণ বিপরীত। যথাযথ প্রতিকার না পেয়ে সাধারণ মানুষও হাসপাতাল ও ডাক্তারদের ওপর দিন দিন ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে। বিভিন্ন হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলোতে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনা ঘটছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে বাংলাদেশের চিকিৎসা ক্ষেত্রে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। চিকিৎসার নামে যারা মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে ও হয়রানি করছে, সরকারের উচিত এখনই তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা। অন্যথায় মানুষের ভেতরে জমে থাকা পুঞ্জিভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটার আশঙ্কা থেকে যায়। নিশ্চয় এটা কারোরই কাম্য নয়।

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক
ই-মেইল : [email protected]

Leave A Reply

Your email address will not be published.